খলিফা পট্টির দর্জিদের দম ফেলার ফুসরত নেই

142

নগরীর আন্দরকিল্লা ওয়ার্ডে একেবারে ছোট্ট একটা এলাকার নাম খলিফা পট্টি। এটি দর্জি পাড়া বলেই খ্যাত। সেখানে রয়েছে ৫ শতাধিক পোশাক তৈরির ক্ষুদ্র কারখানা। রমজান মাস এলেই নির্ঘুম কাজ করে প্রায় ৭ হাজার দর্জি শ্রমিক।

Advertisement

জানা যায়, ১৯৫০ এর দশকে নোয়াখালী বেগমগঞ্জের ক্ষুদ্র ফেরিওয়ালা আইয়ুব আলীর হাত ধরেই গড়ে উঠে এ খলিফাপট্টি। বিগত ৬৫ ববছর ধরে এই ছোট্ট এলাকা ঘিরে এখানে গড়ে ওঠেছে পোষাক শিল্পের সমাহার। পূরানো দিনের হকারগিরি এখন আর নেই। আইয়ুব আলীর পরবর্তী প্রজন্মই এই এলাকার পোষাক তৈরী কারখানার মালিক।

বিগত ৬৫ বছর পূর্বে একেবারে খালি হাতে এসে প্রায় দুই তিন শতাধিক মানুষ এখন এখানকার বড় পাইকারি ব্যবসায়ী। এখান থেকে সারা দেশের মার্কেটগুলোতে নিত্য নতুন ডিজাইনের ঈদজামা সরবরাহ করা হয়। এখানে তৈরী হচ্ছে এবারের ঈদ আকর্ষণ নিত্য নতুন ডিজাইনের নজরকাড়া পোশাক।

এবার নতুন নয়, প্রতিবছরই এখানে তৈরী করা হয় ঈদ জামা। এছাড়া সারা বছরের কমন কাপড় চোপড়ও এখান থেকে ডেলিভারি দেয়া হয়। নিউ মার্কেট, চিটাগাং শপিং কমপ্লেক্স, আমিন শপিং সেন্টার, সেন্ট্রাল প্লাজা, ইউনুস্কু সিটি সেন্টার, স্যানমার ওসান সিটি, ফিনলে স্কয়ার, কেয়ারি ইলেশিয়াম, ভিআইপি টাওয়ার, সিঙ্গাপুর ব্যাংকক মার্কেট, কর্ণফুলী মার্কেট, মুন্নীপ্লাজা, অফমি প্লাজা, মতি টাওয়ার, রিয়াজ উদ্দিন বাজার, সিঙ্গাপুর মার্কেট, মিমি সুপার মার্কেটসহ নগরীর অভিজাত মার্কেট সমূহে খলিফাপট্টির তৈরী পোষাকই শোভা পাচ্ছে।

একসময় তাদের তৈরী পোষাকের কদর ছিল নগরীর রেয়াজ উদ্দিন বাজার, হকার্স মার্কেটসহ বিভিন্ন উপজেলার মাঝারি মার্কেটগুলোতে। কিন্তু গত ১০ বছর থেকে খলিফা পট্টির পোষাক শিল্প কারখানাতেই তৈরী করা হচ্ছে নিত্য নতুন ডিজাইনের ঈদ জামা। আর এসব জামাকাপড় নগরীর অভিজার মার্কেট ছাড়িয়ে এখন ঢাকা, ফেনী, কুমিল্লা, কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও জেলার ১৪ উপজেলার খুচরা মার্কেট পর্যন্ত স্থান করে নিয়েছে।

কথা হয় কারিগর মো. সেলিমের সাথে। তিনি বলেন, শবে বরাতের পর থেকে আমাদের কর্ম ব্যস্ততা আরো বেড়ে গেছে। এমনি সারাবছর ব্যস্ত থাকি।  ঈদের অর্ডারের পরিমাণ বেড়েছে অনেক। এটি আমাদের জন্য একটি ভালো দিক। আমাদের আয়ের দিকটাও বাড়ার সুযোগ হচ্ছে।

খলিফা পট্টির ডিসেন্ট টেইলার্সের কারিগর জুয়েল বলেন, চীন-ভারত থেকে দেশে পোশাক যদি না আসত তাহলে খলিফাপট্টির পোষাক কারখানাই দেশের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতো।

খলিফাপট্টি ব্যবসায়ী সমিতি সূত্র জানায়, খলিফাপট্টিকে কেন্দ্র করে মালিক শ্রমিকসহ প্রায় দশ হাজার মানুষের পরিবার জীবন জীবিকা নির্বাহ করছে। এখানকার ব্যবসায়ীদের সহজশর্তে ঋণদেয়াসহ অন্যান্য সুবিধা দেয়া হলে এখানে দুই বছরের মধ্যে কমপক্ষে ৪০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

খলিফাপট্টি বণিক সমিতির সভাপতি জানান, গত ৬৫ বছর ধরে এশিল্প সরকারি কোন পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি। প্রতিবছর এখানকার তৈরী পোষাকই দেশের বাজার গুলোর বড় ধরণের চাহিদা মেটায়। এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে গত ৬৫ বছরে কমপক্ষে ৫০ হাজার শ্রমিক সৌদি, দুবাইসহ বিদেশে আয় উপার্জন করছে। সুযোগ সুবিধার অভাবে প্রতিবছর ৫-৬ জন ব্যবসায়ী এখান থেকে মাইনাস হয়। এখানকার পুজিঁ নিয়ে কারখানা গুটিয়ে ব্যবসায়ীরা অভিজাত মার্কেটের দিকে ঝুকে পড়ে। তারপরও সমিতির তদারকি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আন্তরিকতার কারণে এ শিল্প কোনভাবে টিকে আছে।

কারখানার মালিকরা জানান, নগরীর অভিজাত মার্কেটের অর্ডার এখন এখানে বেশী। কিন্তু বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে প্রোডাকশন কমে গেছে। চট্টগ্রামসহ সারাদেশের অভিজাত মার্কেটে এখানকার তৈরী কাপড়ের কদর দিন দিন বাড়লেও লোডশেডিং সমস্যার কারণে যথাসময়ে ডেলিভারি দেয়া সম্ভব হয়না।

খলিফাপট্টি ঘুরে দেখা গেছে, ৫ শতাধিক কারখানায় রাত দিন পরিশ্রম করে তৈরী করা পোষাক স্তরে স্তরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ভারতীয় ডিজাইন অনুকরণে তৈরী ফ্রক, স্কাট, ডিভাইডার, থ্রি পিছ, প্যান্ট, শিশুদের জামা কাপড়ে সজ্জিত এখানকার কাজল ফ্যাশন, ভাই ভাই গার্মেন্টস, আজমির গার্মেন্টস, শাহজালাল গার্মেন্টসসহ অধিকাংশ দোকান। এখানে বানানো কাপড় কেয়ারী ইলেশিয়ামসহ মাঝারি ধরনের মার্কেট রিয়াজ উদ্দিন বাজার, হকার্স মার্কেট, গুলজার টাওয়ার, চকবাজার শাহেনশাহ মার্কেট, মতি টাওয়ারসহ সর্বত্র কদর বেশী। নিত্য নতুন বাহারি ডিজাইনের নানান রংয়ের ঈদের পোষাক তৈরীতে ব্যস্ত এখানকার ৫০০ কারখানার ৯০০ কারিগর ও ৭ হাজার দর্জি শ্রমিক। ঈদ সন্নিকটে তাই সারাদেশের অর্ডার পূরণ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। নির্ঘুম রাত, রাতদিন বিরামহীনভাবে চলছে ঈদের পোষাক তৈরীর কাজ।

Advertisement