ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি

চট্টগ্রামের ৩২ উপজেলার নাগরিকদের ভোগান্তি কমতে যাচ্ছে

31

বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও ভোটার তালিকায় নিজ নাম অন্তর্ভুক্ত করতে পোহাতে হয় নানা ভোগান্তি। মূলত মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কারণেই গত পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৩২টি বিশেষ এলাকার স্থানীয় নাগরিকদের। চট্টগ্রাম অঞ্চলের এই ৩২ অঞ্চলের নাগরিকদের ভোটার হতে যথাযথ ডকুমেন্ট দিলেও বিশেষ কমিটির ছাড়পত্র ছাড়া ভোটার তালিকায় নাম উঠানো সম্ভব হয় না।

Advertisement

ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী রোহিঙ্গারা যাতে ভোটার তালিকাভুক্ত হতে না পারে, সেজন্য ভোটার তালিকা করার সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। এই বিশেষ এলাকার জন্য বিশেষ কমিটির মাধ্যমে নিবন্ধন ফরম যাচাই-বাছাই করা হয় এবং রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক সংবলিত ডাটাবেজও ব্যবহার করা হয়। তবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নতুন সচিব শফিউল আজিমের উদ্যোগে কমতে যাচ্ছে এ অঞ্চলের স্থানীয়দের ভোগান্তি। ইসি সচিব ইতোমধ্যেই এই বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, ২০১৯ সালে রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি ঠেকাতে চট্টগ্রামের ৩২টি উপজেলাকে ‘বিশেষ এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ কমিটি গঠন করে ইসি। ওইসময় প্রত্যেক উপজেলায় ১৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। তবে গত বছর ১৫ সদস্যের আগের কমিটিকে ১২ সদস্যে নামিয়ে আনে ইসি। গত বছর ইসির পুনর্গঠিত ১২ সদস্যের কমিটিতে রাখা হয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সহকারী কমিশনার (ভূমি), থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তার অবর্তমানে উপপরিদর্শক (এসআই) সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) পদমর্যাদার নিচে নয়), বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি (কর্মকর্তার নিচে নয়), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের প্রতিনিধি (কর্মকর্তার নিচে নয়), প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি (কর্মকর্তার নিচে নয়), জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি (কর্মকর্তার নিচে নয়), স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রতিনিধি (কর্মকর্তার নিচে নয়), হেডম্যান (পার্বত্য জেলার ক্ষেত্রে) অথবা কারবারি (পার্বত্য জেলার ক্ষেত্রে), সংশ্লিষ্ট পৌরসভার মেয়র অথবা প্যানেল মেয়র, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান অথবা প্যানেল চেয়ারম্যান এবং উপজেলা নির্বাচন অফিসার (সংশ্লিষ্ট উপজেলা)।

বিশেষ কমিটির আহ্বায়ক হচ্ছেন ইউএনও আর সদস্য সচিব উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা। বিশেষ কমিটির আহ্বায়ক ওই কাজ দ্রুত সম্পন্নের প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট উপজেলার এক বা একাধিক কর্মকর্তাকে কমিটিতে কো-অপ্ট করতে পারবেন। এছাড়াও, সংশ্লিষ্ট এলাকার স্বনামধন্য শিক্ষক, বিশিষ্ট নাগরিক, সংরক্ষিত আসনের মহিলা কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত আসনের মহিলা সদস্যদেরকেও কমিটিতে কো-অপ্ট করতে পারবেন।

চট্টগ্রামের ৩২ উপজেলায় ভোটার করতে কমিটি যেসব কাজ করে থাকে

(১) কমিটি প্রতিমাসে ন্যূনতম একটি সভা অনুষ্ঠান করবে, প্রয়োজনে একাধিক সভা অনুষ্ঠান করবে। কমিটি বিশেষ তথ্য ফরমে প্রদত্ত সকল জাতীয় পরিচয়পত্রের এনআইডি নম্বরসমূহ অনলাইনে যাচাই করবে। যাচাইয়ের সময় নিম্নলিখিত বিষয়াদি পর্যবেক্ষণ করতে হবে- (ক) ভাই/বোনের ডাটাবেজে পিতা/মাতার নামের সাথে আবেদনকারীর উল্লিখিত পিতা/মাতার নামের মিল থাকতে হবে। (খ) চাচা/ফুফুর ডাটাবেজে তাদের পিতার নাম ও ঠিকানার সাথে আবেদনকারীর বিশেষ তথ্য ফরমে প্রদত্ত পিতামহের নাম ও ঠিকানার মিল থাকতে হবে। (গ) প্রয়োজনে নিকট আত্মীয়ের মোবাইল নম্বরে কথা বলে তাদের পরিচিতি/তথ্য সম্পর্কিত বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে।

(২) ভোটার তালিকা আইন, ২০০৯ অনুযায়ী ভোটার হতে ইচ্ছুক উপযুক্ত ব্যক্তিকে বাংলাদেশের কোথাও ‘সচরাচর নিবাসী’ হতে হবে। নির্বাচন কমিশনের জারিকৃত পরিপত্রে উল্লিখিত জেলাসমূহের যদি কেউ সচরাচর নিবাসের দাবি করে তবে সেই দাবির যথার্থতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসন্ধান করতে হবে। শুধু একটি নিবাসের ঠিকানাই এর জন্য যথেষ্ট হবে না। নিবাসের প্রমাণস্বরূপ তাকে এ সংক্রান্ত প্রণীত অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহ ফরম অনুযায়ী চাহিত সব তথ্য প্রদান করতে হবে।

(৩) যদি সংশ্লিষ্ট জেলাসমূহে এই সমস্ত ব্যক্তি নিজস্ব সম্পত্তির সূত্রে তালিকাভুক্তির দাবি করে, তবে তাদের সম্পত্তির মালিকানা ও এ সংক্রান্ত অন্যান্য দালিলাদি তথ্যসংগ্রহকারীকে প্রদান করতে হবে।

(৪) যারা বাংলাদেশি কোনো নাগরিকের সাথে বৈবাহিক সূত্রে ভোটার তালিকাভুক্তির দাবি করবেন, তাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত নাগরিক সনদপত্রসহ সংশ্লিষ্ট দলিলাদি তথ্য সংগ্রহকারীকে প্রদান করতে হবে এবং অন্য কোনো সূত্রে কেউ ভোটার হওয়ার উপযুক্ত দাবি করলে, তাদেরকে এ সম্পর্কিত প্রমাণাদি/তথ্য প্রদান করতে হবে।

(৫) তথ্য সংগ্রহকারীরা প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফরম-২’র সাথে এ কার্যক্রমের আওতায় অতিরিক্ত তথ্য ফরম পূরণের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় দালিলিক কাগজপত্রসহ প্রতিটি কেস উপজেলা নির্বাচন অফিসারের কাছে জমা দেবেন। উপজেলা নির্বাচন নির্বাচন অফিসার আবেদন/কেসসমূহের সারসংক্ষেপ/চেকলিস্ট প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট পৌরসভা/ইউনিয়ন পরিষদের নিকট প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পাঠাবেন এবং সংশ্লিষ্ট পৌরসভা/ইউনিয়ন পরিষদের প্রাথমিক যাচাই-বাছাই প্রতিবেদনসহ সব কাগজপত্রাদি উপজেলা বিশেষ কমিটির নিকট উপস্থাপন করবেন।

(৬) উপজেলা বিশেষ কমিটি প্রতিটি ফরম পুঙ্খনাপুঙ্খভাবে যাচাই বাছাইপূর্বক সিদ্ধান্ত প্রদান করবেন। গ্রহণযোগ্য কেসগুলোতে উপজেলা বিশেষ কমিটির ইতিবাচক সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাচন অফিসারকে অবহিত করার পর তিনি ওই সমস্ত নাগরিকদের ভোটার তালিকাভুক্ত করার জন্য দিনক্ষণ নির্ধারণ করে নিবন্ধন কেন্দ্রে তাদের আগমনের জন্য নোটিশ জারি করবেন। যাদের কেস গ্রহণ করা হবে না- কি কারণে তা গ্রহণ করা হলো না, প্রতিটি কেসের জন্য নোটশিটে কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষরে তা লিপিবদ্ধ করতে হবে। এছাড়া, উপজেলা নির্বাচন অফিসার প্রতিটি বিশেষ তথ্য ফরমের (ফরম-২ এর অতিরিক্ত তথ্য) ১৬ নম্বর ক্রমিকে বিশেষ কমিটির সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ করবেন (যেমন: আবেদনকারীর নাম, নিবন্ধন ফরম নং এর আবেদনটি গ্রহণ/বাতিল করা হলো)।

(৭) ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য যারা ২০০৭-২০০৮ সালে ভোটার তালিকাভুক্ত হয়েছেন কিংবা যাদের অনুকূলে বাংলাদেশের পাসপোর্ট জারি করা হয়েছে তাদের জন্য ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত বিধান প্রযোজ্য হবে না।

(৮) কোনো কেস/আবেদনের বিষয়ে স্পষ্টীকরণের প্রয়োজন হলে কমিটির একজন সদস্যকে দিয়ে সরেজমিন তদন্ত করতে এবং প্রয়োজন হলে কমিটির সভায় শুনানি গ্রহণ করতে পারবেন।

(৯) উপজেলা বিশেষ কমিটি যাদের আবেদন বাতিল করবে, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি খসড়া তালিকা প্রকাশের পর উক্ত বিষয়ে বিশেষ কমিটির সিদ্ধান্তের অনুলিপি নিয়ে সংশোধনকারী কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে পারবেন।

(১০) রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার ক্ষেত্রে যদি কেউ সহযোগিতা অথবা মিথ্যা তথ্য প্রদান অথবা মিথ্যা/জাল কাগজপত্র সরবরাহ করেন অথবা সংশ্লিষ্ট কারও গাফিলতি পরিলক্ষিত হয় তাদের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা আইন, ২০০৯ ও জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন, ২০১০ এবং প্রচলিত অন্যান্য আইন অনুযায়ী ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে হবে।

মূলত একজন বাংলাদেশির ভোটার হতে যেসব তথ্য লাগে, নাগরিকদের ১৭ ডিজিটের অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ (যদি থাকে), পিতামাতার এনআইডির ফটোকপি, চেয়ারম্যান/কমিশনারের প্রত্যয়ন, ইউটিলিটি বিলের কপির প্রয়োজন হবে। এছাড়া ক্ষেত্রবিশেষ আরও কিছু দলিলাদির প্রয়োজন পড়ে।

সচিব শফিউল আজিম জানান, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ এলাকার যেসব নাগরিকের অ্যাকাডেমিক সনদ বা বৈধ কাগজপত্র আছে, তাদের সন্দেহভাজন রোহিঙ্গাদের মতো একই ক্যাটাগরিতে না ফেলে তাদের ভোটার নিবন্ধন সহজ করতে হবে। প্রয়োজনে এ সংক্রান্ত কমিটির পুনর্গঠন ও তাদের কার্যপরিধি হালনাগাদ করতে হবে। এজন্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাকে সুপারিশসহ আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে প্রতিবেদন দিতে হবে। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের চলতি মাসের সমন্বয় সভায় এই নির্দেশনা দেন ইসি সচিব।

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. ইউনুচ আলী বলেন, ঈদের আগে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের গত ১৩ জুন মাসিক সমন্বয় সভায় এই অঞ্চলের অর্থাৎ ৩২টি বিশেষ এলাকা বা উপজেলার নাগরিকদের ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি আরও সহজ করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন সচিব। এই উপলক্ষ্যে ঈদের ছুটির আগে চট্টগ্রাম অঞ্চলে দুইটি ওয়ার্কশপ করা হয়েছে এবং আমরা আমাদের অফিসারদের সেভাবেই নির্দেশনা দিয়েছি।

এক প্রশ্নে তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা এদেশে প্রবেশের পর থেকেই এই ৩২টি উপজেলার নাগরিকদের ভোটার হতে বিশেষ কমিটির ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয়। কমিটির ছাড়পত্র ছাড়া ৩২ অঞ্চলের কেউই ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে পারে না। তবে সচিবের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা শিগগিরই বসে সুপারিশসহ প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে পাঠিয়ে দেবো।

ইসির চলতি বছরের চূড়ান্ত হিসেব অনুযায়ী দেশে বর্তমানে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ১৮ লাখ ৫০ হাজার ১৬০ জন। এদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৫৮৭ জন, আর নারী ভোটার ৫ কোটি ৯৭ লাখ ৪ হাজার ৬৪১ জন। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন ৯৩২ জন। এক বছরের তুলনায় ভোটার সংখ্যার হার বৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২.২৬ শতাংশ। যা প্রায় ১৭ কোটি মোট জনসংখ্যার ৭১.৭৪ শতাংশ। ২০০৭-২০০৮ সালে নবম সংসদের আগে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা হয়। এ ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর নতুন করে ভোটারযোগ্যরা তালিকাভুক্ত হন এবং মৃতদের বাদ দেওয়া হয় হালনাগাদে। সবশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন থাকায় ২১ জানুয়ারি হালনাগাদের ভোটারযোগ্যদের খসড়া তালিকা প্রকাশ করে ইসি।

Advertisement