ফটিকছড়ি প্রতিনিধি: ‘পানির মতো সহজ’ কথাটি পানির ক্ষেত্রে আর খাটছে না। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার দুই তৃতীয়াংশ গ্রামে নলকূপে এখন মিলছে না পানি। বছর পাঁচেক আগেও যেসব এলাকায় পানি ছিল সহজলভ্য, এখন সেখানেই তীব্র সংকট। এখানে অসংখ্য ছড়া, খাল ও নদী থাকার পরও চলছে হাহাকার। ফলে দিশেহারা লাখো মানুষ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষিতে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বেড়েছে। অপরিকল্পিতভাবে পানি তোলার কারণে ক্রমাগত নামছে পানির স্তর। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টি কমেছে। ফলে গ্রামের মানুষকেও এখন তৃষ্ণা মেটাতে টাকা খরচ করতে হচ্ছে। লাগামহীন পানি তোলা বন্ধ না হলে সামনে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দেবে।
অনুসন্ধানে জানাগেছে, উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ও হালদা-ধুরুং নদীর চর শস্যের অন্যতম ভান্ডার। গত কয়েক বছরে রবিশস্য ছেড়ে বোরো ধান চাষে ঝুকেছেন কৃষকরা। শুষ্ক মৌসুমে ধান আবাদই এখন উপজেলার জন্য অভিশাপ। খাল-বিল-ডোবায় ভরপুর মিঠাপানির রাজ্যে এখন হাহাকার। ধান চাষে ভূগর্ভের পানির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারণে নলকূপে উঠছে না পানি। পরিকল্পনা ও অনুমোদন ছাড়াই চাষিরা এক-দেড় হাজার গভীর নলকূপ বসিয়ে সেচকাজে ব্যবহার করছেন। এর প্রভাবে উপজেলাজুড়ে পানির হাহাকার চলছে।
উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের হিসাবে, এখানে আড়াই হাজারের বেশি গভীর সেচ পাম্প রয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কার্যালয়ের হিসাবে রয়েছে ২৫০টি। চাষিরা ব্যক্তিগতভাবে তিন হাজারের বেশি পাম্প বসিয়েছেন। একটি গভীর নলকূপে প্রতি ঘণ্টায় দেড় হাজার কিউসেক পানি উঠে। গভীর-অগভীর নলকূপ স্থাপনের ফলে ভূগর্ভ থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনে দ্রুত নামছে স্তর। ফলে গত পাঁচ বছরে অন্তত ১০ ফুট নেমেছে পানির স্তর।
দক্ষিণ দৌলতপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. সাজিব বলেন, ‘কৃষিকাজে ব্যবহৃত সেচপাম্পের কারণে বাড়ির নলকূপসহ এলাকার কোথাও পানি নেই। ফলে নিত্যব্যবহার্য্যরে কাজে পানির অভাব মারাত্মকভাবে দেখা দিয়েছে। দিনের বেশিরভাগ সময় দুর-দুরান্ত থেকে পানি এনে গৃহস্থালীর কাজ সারা হচ্ছে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাসানুজ্জামান বলেন, ‘আগে আমনের পাশাপাশি রবি ফসল হতো। ইদানিং সেখানে পানিনির্ভর বোরো হচ্ছে। এ চাষাবাদ পুরোটাই ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর। অন্যদিকে গড় বৃষ্টিপাত কমেছে। পানি উত্তোলন বেড়েছে। আবার বৃষ্টি কমে যাওয়ায় মাটির নিচে পানির পুনর্ভরণ হচ্ছে না। এ জন্য পানির স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। এটি অব্যাহত থাকলে শিগগির পানিশূন্য অবস্থা তৈরি হবে।’
উপজেলা পরিবেশ সাংবাদিক সমিতির সভাপতি সোলাইমান আকাশ বলেন, ‘পানির অপচয় রোধ করতে হবে। প্রচুর গাছপালা লাগানো, নদী ও খালবিলের গভীরতার পাশাপাশি সংখ্যা বাড়ানো দরকার। যেন বৃষ্টির পানি দীর্ঘদিন জমা থাকে এবং কৃষিকাজে ব্যবহার করা যায়।’
উপজেলা জনস্বাস্থ্যপ্রকৌশলী মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলার যে সব অঞ্চলে তীব্র পানির সংকট সেখানে আমরা ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছি। শীঘ্রই সেচপাম্পগুলো ব্যবহারে নীতির আওতায় আনা হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘সেচপাম্পের কারণে এত মানুষ কষ্ট পেতে পারে না। সমস্যাগুলো কীভাবে দ্রুত সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে আমরা কাজ করছি। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সহায়তায় পানির অপচয় রোধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। আশা করছি, দ্রুতই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।’

















