চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় প্রাণীদের তহবিলের টাকা নানা খাতে খরচ করার অভিযোগ উঠেছে। কোটি টাকার তহবিল যেখানে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল পশু-পাখির খাবার, চিকিৎসা ও আবাসন উন্নয়নে; সেই অর্থই এখন যাচ্ছে জাতীয় দিবস পালনে অনুদান, বিজ্ঞাপন আর কর্মকর্তাদের পরিচিতজনদের সহায়তায়। চিড়িয়াখানার গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম তহবিল থেকে কয়েক মাসে নানা খাতে ব্যয় করেছেন প্রায় ১৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
অথচ ২০১২ সালে প্রণীত চিড়িয়াখানার গঠনতন্ত্রে আর্থিক অনুচ্ছেদে তহবিলের টাকা প্রাণীদের খাবারের জন্য ব্যয় করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি নির্বাহী কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে চিড়িয়াখানার অবকাঠামো উন্নয়নের কাজেও তা ব্যয় করা যাবে বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে তার উল্টো।
নথি অনুযায়ী, ডিসি ফরিদা খানম তার ২৪তম বিসিএস প্রশাসন অ্যাসোসিয়েশনের গ্র্যান্ড পুনর্মিলনী ও পিকনিক উপলক্ষ্যে দুই দফায় বিজ্ঞাপন বাবদ চিড়িয়াখানার তহবিল থেকে ২ লাখ টাকা খরচ করেছেন। এ ছাড়া রংপুরে কর্মরত শিক্ষানবিশ সহকারী কমিশনার ঝন্টু আলী সরকারকে ব্যক্তিগত অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়েছে ১ লাখ টাকা।
আবার বিজয় দিবস উদযাপনের জন্য ৫ লাখ টাকা, ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস ও ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে আরও ৫ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে। তবে বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে দেওয়া ৫ লাখ টাকার অনুদানটি কার কাছে গেছে, নথিতে তার উল্লেখ নেই।
নথিতে দেখা যায়, ঢাকা বিয়াম ফাউন্ডেশনে এসি বিস্ফোরণে হতাহতদের সহায়তায় ৩ লাখ টাকা অনুদান, বিভাগীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার বিজ্ঞাপন বাবদ ৫০ হাজার টাকা, এইচএল ফাউন্ডেশন ফর সোশ্যাল এক্সিলেন্সকে বিজ্ঞাপন বাবদ ১ লাখ টাকা এবং ডিসি পার্কে রং করায় ব্যয় হয়েছে আরও ১ লাখ ২৪ হাজার ৫০৫ টাকা।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার কিউরেটর ডা. শাহাদাত হোসেন শুভর কাছে জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে পরামর্শ দেন।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও চিড়িয়াখানার সভাপতি ফরিদা খানম বলেন, চিড়িয়াখানা আমাদেরই প্রতিষ্ঠান। আমাদের ঘরের টাকা আমরা যেভাবে চাই, সেভাবে খরচ করব; এটাই তো নিয়ম। এক্ষেত্রে কোনো নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেনি। তাছাড়া আমি চিড়িয়াখানায় প্রচুর অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ করেছি। রংপুরের কর্মকর্তার পরিবারকে মানবিক বিবেচনায় সহায়তা করেছি। আমাদের ব্যাচের অনুষ্ঠানে অনুদান দিয়েছি। অন্য খরচগুলোও জাতীয় দিবস উদযাপন বা বিজ্ঞাপন বাবদ হয়েছে।
১৯৮৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ২ একর জায়গা নিয়ে যাত্রা শুরু করা চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা বর্তমানে ১০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। বর্তমানে ৬৮ প্রজাতির ৫২০টি প্রাণী দেখতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন হাজার দর্শনার্থী সেখানে যান। চিড়িয়াখানার বার্ষিক আয় ৭ কোটি টাকারও বেশি।
এই বিপুল আয় থেকে খরচ বাদে উদ্বৃত্ত অর্থ একটি নির্ধারিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা রাখা হয়, যা মূলত প্রাণী সংগ্রহ, আবাসন উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ ও সম্প্রসারণ কাজে ব্যবহার হওয়ার কথা। কিন্তু সাম্প্রতিক একাধিক নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ওই তহবিল থেকে নানা খাতে অনুদান ও বিজ্ঞাপনের নামে বিতরণ করা হয়েছে লক্ষাধিক টাকা। যদিও চিড়িয়াখানার পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে জেলা প্রশাসকের পদাধিকার রয়েছে, তবুও খরচের ক্ষেত্রে সরকারি বিধি অনুসরণ না করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতাকে বড় প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে। এমন স্বেচ্ছাচারিতার কারণে চিড়িয়াখানার ভবিষ্যতই হুমকিতে পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এস আলমের ব্যাংকে কোটি টাকার এফডিআর
তহবিল ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ ২ কোটি টাকার মেয়াদী আমানত (এফডিআর) করে মার্কেন্টাইল ব্যাংক ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকে। এর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা সংকটাপন্ন এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকে রাখা হয়েছে ১ কোটি টাকা। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিতর্কিত ব্যাংকে সরকারি তহবিল রাখা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল।
চিড়িয়াখানার তহবিল থেকে ব্যক্তিগত অনুদান দেওয়া যায় কি না— সংবাদমাধ্যমের এমন প্রশ্নে বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, ‘এই ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। তবে খোঁজ নিয়ে জানালে আমার করণীয় ঠিক করতে পারবো।’

















