চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মোঃ জিয়াউদ্দীন বলেছেন, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব রোধকল্পে বর্তমান সরকার জরুরী ভিত্তিতে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী সকল শিশুকে হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হলে হাম ছড়ানোর আর কোনো সুযোগ থাকবে না। তবে ঝুঁকির্পর্ণ ও দুর্গম এলাকাসহ সব জায়গায় এ বয়সের কোন শিশু যাতে হাম-রুবেলার টিকা থেকে বাদ যা পড়ে সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। হাম নিমূলে সর্বত্র সচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই। হাম-রুবেলার টিকা নিয়ে কেউ গুজব ও অপপ্রচার ছড়ালে ব্যবস্থা নেয়া হবে, এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
হাম-রুবেলার জরুরী টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৬ উপলক্ষে আজ ১৯ এপ্রিল রোববার সকাল ১১টায় বিভাগীয় কমিশনার কর্যালয়ের কনফারেন্স হলে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক কার্যালয় আয়োজিত বিভাগীয় পর্যায়ের অ্যাডভোকেসী সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সারাদেশের ন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগেও আগামীকাল ২০ এপ্রিল সোমবার থেকে হাম-রুবেলার টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হয়ে চলবে ১০ মে পর্যন্ত। সরকারী ছুটির দিন ব্যতীত প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এ ক্যাম্পেইন চলবে।
আগামীকাল ২০ এপ্রিল সোমবার সকাল ৯টায় সীতাকুন্ডের জঙ্গল-সলিমপুরে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক কার্যালয় ও চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে হাম-রুবেলার টিকাদান ক্যাম্পেইন উদ্বোধন করা হবে।
সভায় বিভাগীয় কমিশনার বলেন, হাম-রুবেলার টিকাদান ক্যাম্পেইন সফল করতে সর্বত্র মাইকিং করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম বিভাগে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ৪২ লাখ শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুর ১৭ ডিজিটের জন্ম নিবন্ধন নম্বর দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করে হাম-রুবেলার টিকা নেয়া যাবে।এ ক্যাম্পেইনের প্রচার-প্রচারণার তদারকি বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে দফাদার-চৌকিদারদের (গ্রাম পুলিশ) দায়িত্ব পালনে চিঠি ইস্যু করা হবে। অন্যান্য বারের মতো টিকাদান ক্যাম্পেইনে আমরা এবারও দেশের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করবো, চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার মাধ্যমে আমরা গৌরব অর্জন করবো-এ লক্ষ্যে আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করবো।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে হাম-রুবেলার টিকাদান ক্যাম্পেইন সম্পর্কিত বিষয়বস্তু আলোকপাত করেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভাগীয় সমন্বয়কারী ডা. ইমং প্রু চৌধুরী।
অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের পরিচালক (স্থানীয় সরকার) মনোয়ারা বেগম, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) নুসরাত সুলতানা, অতিরিক্ত ডিআইজি সঞ্জয় সরকার, পরিবার পরিকল্পনা চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক আবু সালেহ মোঃ ফোরকান, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুছা মিয়া, মাউশি’র চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক প্রফেসর মোঃ ফজলুল কাদের, ইউনিসেফ’র স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. দেলোয়ার হোসেন, প্রাথমিক শিক্ষা চট্টগ্রাম বিভাগীয় উপ-পরিচালক মোঃ নূরুল ইসলাম, খাগড়াছড়ি জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের, কুমিল্লা জেলা সিভিল সার্জন ডা. আলী নুর মোঃ বশীর আহমদ, চাঁদপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোঃ নুর আলমদীন, লক্ষীপুর জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ আবু হাসান শাহীন, নোয়াখালী জেলা সিভিল সার্জন ডা. আনোয়ার হোসেন, রাঙ্গামাটি জেলা সিভিল সার্জন ডা, নূয়েন খীসা, পরিবার পরিকল্পনা লক্ষীপুর জেলার উপপরিচালক নাজমুল হাসান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার উপ-পরিচালক মোঃ মোস্তফা কামাল, বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় পরিচালক মোস্তফা মনসুর আলম খান, পিআইডি’র উপ-প্রধান তথ্য অফিসার মোঃ সাঈদ হাসান, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. তপন কুমার চক্রবর্তী প্রমূখ। সভায় বিভিন্ন জেলা পরিবার পরিকল্পনা, সিভিল সার্জনের প্রতিনিধি, স্টেক হোল্ডারগণ উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকগণ সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন।
অ্যাডভোকেসী সভায় চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে গত ৫ এপ্রিল থেকেই দেশের ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলা ও ১৩টি পৌরসভায় জরুরি ভিত্তিতে প্রথম দফায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে মন্ত্রণালয়।
এ সময়ে চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার জেলার রামু, মহেশখালী, চাঁদপুর জেলা সদর ও হাইমচর উপজেলাও কর্মসূচী শুরু হয়। গত ১২ এপ্রিল ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, বরিশাল ও ময়মনসিংহে দ্বিতীয় দফায় হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। আগামী ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে এই হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়ে ১০ মে পর্যন্ত চলবে। চট্টগ্রাম বিভাগে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ৪২ লাখ শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুর ১৭ ডিজিটের জন্ম নিবন্ধন নম্বর দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করে হাম-রুবেলার টিকা নেয়া যাবে।
চট্টগ্রাম বিভাগের মোট ১৬৪টি স্থায়ী কেন্দ্র, ২৪ হাজার ৬৪০টি ভ্যাকসিনেশন সেন্টারে সরকারী ছুটির দিন ব্যতীত প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এ টিকা দেয়া হবে। ক্যাম্পেইন চলাকালীন সময়ে ১ হাজার ১৫টি মপ-আপ টিম ও সান্ধ্যকালীন ১৬টি টিম এ টিকা প্রদানের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে। যে কোন মূল্যে হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন সম্পন্ন করা হবে।
সভায় আইসিডিডিআর,বি’র বরাত দিয়ে তিনি বলেন, হাম-রুবেলার জন্য সবাই হাসপাতালে আসবে না, তাদেরকে তৃণমূলে সেবা দিতে হবে। হাম বা মিজেলস একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত জ্বর শুরুর ৭-১০ দিনের মধ্যে নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়। হাম থেকে রক্ষায় শিশুকে বেশি করে তরল খাবারের পাশাপাশি অল্প অল্প করে পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। জ্বর হলে কুসুম গরম পানিতে শরীর মুছতে হবে। প্রয়োজনে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট দিতে হবে এবং চোখ পরিস্কার রাখার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন ’এ’ খেতে হবে। শিশুর শ্বাসকষ্ট বা শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হলে বা বুকের খাঁচা দেবে গেলে, তরল খাবার বা বুকের দুধ খেতে না পারলে, বারবার বমি হলে, খিঁচুনি, নিস্তেজ, তন্দ্রাচ্ছন্ন বা ডাকে সাড়া না দিলে, মুখে ঘা, চোখে সমস্যা বা চোখ খুলতে না পারলে এবং তীব্র পানি শূন্যতা বা অপুষ্টি-এগুলোর যে কোন একটি লক্ষণ দেখা দিলে দেরী না করে দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে নিতে হবে। এ লক্ষ্যে সর্বত্র প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রাখতে হবে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, হাম একদিকে যেমন দ্রুত ছড়ায়, অন্যদিকে সঠিক সময়ে টিকার মাধ্যমে এটি প্রতিরোধ করাও বেশ সহজ। এটি মূলত ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা গোষ্ঠীগত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মতো কাজ করে। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বড় অংশকে যদি টিকার আওতায় এনে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করা যায়, তবে ওই এলাকার সব শিশু সুরক্ষিত থাকবে। অধিকাংশ শিশুকে এই টিকাদান কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হলে হাম ছড়ানোর আর কোনো সুযোগ থাকবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
















