চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে আন্তর্জাতিক নার্সেস দিবস পালন

বর্তমান সময়ে নার্সিং পেশা অত্যন্ত মহৎ ও সেবাধর্মী: বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক

43

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেছেন, আমাদের সমাজের অন্যতম গর্বিত অংশ নার্স। বর্তমান সময়ে নার্সিং পেশা অত্যন্ত মহৎ ও সেবাধর্মী। এটি দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদার চাকুরী। অসুস্থ জাতিকে সুস্থ করে কর্মক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার দায়িত্বে তাদের ভূমিকা অপরিসীম। নার্সদের কঠিন পরিশ্রম ও তাদের সেবা ছাড়া কোনো রোগীর সুস্থ হয়ে উঠা কঠিন। আজ সেই মানুষদের শ্রদ্ধা জানানোর দিন। স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে সারাদেশে তিন লক্ষাধিক নার্সের প্রয়োজন হলেও অনেক ঘাটতি রয়েছে। ৪ বছর মেয়াদী বিএসসি ইন নার্সিং ও ৩ বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফ কোর্স সম্পন্ন করে চাকুরীতে নিয়োগ লাভের মাধ্যমে হাসপাতাল-ক্লিনিকে ডাক্তারদের পাশাপাশি নার্সরা নিরলসভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। কোন ধরণের বৈষম্য না রেখে নারীদের পাশাপাশি পুরুষেরা নার্সিং পেশায় সম্পৃক্ত হলে এ পেশা আরও মর্যাদাপূর্ণ স্থানে পৌঁছবে।

Advertisement

আজ ১২ মে মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রাম ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের সকল নার্সিং কর্মকর্তা আয়োজিত আন্তর্জাতিক নার্সেস দিবস-২০২৬ এর আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

আলোচনা সভা শেষে কেক কেটে আধুনিক নার্সিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল’র ২০৬তম জন্মবার্ষিকী পালন করা হয়। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে-‘আমাদের নার্স আমাদের ভবিষ্যৎ, জীবন রক্ষায় প্রয়োজন নার্সদের ক্ষমতায়ন’।

অনষ্ঠানের শুরুতে সকাল ৯টায় হাসপাতাল প্রাঙ্গনে বেলুন ও শান্তির পায়রা উড়িয়ে আন্তর্জাতিক নার্সেস দিবসের শুভ উদ্বোধন করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ডা. সেখ ফজলে রাব্বি। এর পর একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের করা হয়। এটি প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করেন। র‌্যালিতে অতিথিবৃন্দরাসহ, নার্সিং সুপারভাইজার, সিনিয়র স্টাফ নার্স, নার্স, মিডওয়াইফ ও কর্মচারীরা অংশ নেন।

সভায় চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, স্বাস্থ্যসেবায় দক্ষতা বৃদ্ধি, পেশাগত উন্নয়ন ও নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখতে পারলে নার্সদের ক্ষমতায়ন হবে। চিকিৎসার মানোন্নয়নে টিম জেনারেল হাসপাতালের নতুন নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনে আমরা গর্বিত। এ হাসপাতালের আইসিইউতে ডায়ালাইসিস সেবা উদ্বোধনের পর নতুন দিগন্তের উন্মোচন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সকলেই আন্তরিক হলে আমরা ডাক্তার-নার্স ও রোগীবান্ধব হাসপাতাল গড়তে পারবো। আধুনিক নার্সিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা, সমাজ সংস্কারক ও পরিসংখ্যানবিদ মহিয়সী নারী ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল’র জীবনী থেকে শিক্ষা নিয়ে সমাজের দরিদ্র-অসহায় মানুষের সেবায় নার্সদের এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি।

জেনারেল হাসপাতালের সেবা তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত) মঞ্জু রানী দাশের সভাপতিত্বে, সিনিয়র স্টাফ নার্স তপন চন্দ্র দে ও সিনিয়র স্টাফ নার্স বাপ্পী দাশের যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নার্সেস দিবসের আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন জেনারেল হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ও অর্থোপেডিক সার্জারী সার্জারী বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. অজয় দাশ, চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম, জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট (গাইনী) ডা. রওশন আরা বেগম, আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. কে.এম আশিক আমান, আইসিইউ বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেস্থেসিওলজি) ডা. রাজদ্বীপ বিশ্বাস, জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেস্থেসিওলজি) ডা. মৌমিতা দাশ ও বাংলাদেশ নার্সেস এসোসিয়েশন (বিএনএ) চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক খন্দকার রাশেদুল আলম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স শর্মিলা মল্লিক।

অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত নার্সিং সুপারভাইজার দীপ্তি ভট্টাচার্য, সিনিয়র স্টাফ নার্স চায়না রানী শীল, অসিত কান্তি দাশ, দীপংকর রুদ্র, আকলিমা আক্তার, মিডওয়াইফ বিবি হালিমা প্রমূখ।

আলোচনা সভায় অন্যান্য বক্তারা বলেন, চিকিৎসাসেবায় ডাক্তার ও নার্স একে অপরের পরিপূরক। স্বাস্থ্যসেবার মান আরও দৃশ্যমান করতে বর্তমান সরকার নার্সিং পেশাকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে। চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি রোগীদের সাথে নার্সদের ভালো ব্যবহার, যোগাযোগ ও নিয়মিত উপস্থিতি স্বাস্থ্য বিভাগের সম্মানটুকুও বৃদ্ধি পাবে। কারণ ভালো ব্যবহার পেলে রোগীরা অর্ধেক সুস্থতা অনুভব করে। এজন্য সবাইকে আরও আন্তরিক হয়ে রোগীদেরকে সেবা দিতে হবে।

বক্তারা আরও বলেন, আমাদের দেশের রোগীরা উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, কানাডা, মালয়েশিয়া ও অন্যান্য দেশে যায়। সে সকল দেশের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবায় রোগীরা সন্তুুষ্ট। সেখানকার হাসপাতালের নার্সরা রোগীদের সাথে ভালো আচরণের মাধ্যমে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে সেবা দেয়। আমাদের দেশেও সরকারী-রেসরকারী অনেক নার্সিং ইনস্টিটিউট রয়েছে। সেগুলো থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে নার্সগণ রোগীদের সেবার উদ্দেশ্যে হাসপাতাল-ক্লিনিকে চাকুরী করছে। তাই উন্নত চিকিৎসা-সেবা নিশ্চিত করতে ডাক্তার-নার্সসহ প্রত্যেককে সেবার মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে। সবসময় রোগীর পাশে থেকে সেবা দিতে হবে। রোগীর সমস্যাকে নিজের সমস্যা মনে করে নিজের অবস্থান থেকে আন্তরিকভাবে সেবা দিতে হবে।

উল্লেখ্য যে, ১৮২০ সালে ১২ মে ইতালির এর আভিজাত পরিবারে ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলের ১৯৭৪ সাল থেকে তাঁর জন্মদিনটি ‘ইন্টারন্যাশনাল নার্সেস ডে’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। ডার্বিশায়া থেকে ১৭ বছর বয়সে লন্ডনে আসেন ফ্লোরেন্স। সেই সময় লন্ডনের হাসপাতালের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। কারণে কোনও সেবিকা সে সময় কাজ করতেন না। সে সময় নার্সিং পেশাকে সামাজিকভাবে মর্যাদা দেওয়া হত না। তা সত্ত্বেও নাইটিংগেল লড়াই করেন। তিনি ১৮৫১ সালে নার্সের প্রশিক্ষণ নিতে জার্মানিতে যান। তারপর তিনি নজে ১৮৬০ সালে নার্সিংকে সম্পূর্ণ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য স্থাপন করেন নাইটিংগেল ট্রেনিং স্কুল। তারপর ১৮৬৭ সালে নিউইয়র্কে চালু হয় উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ।

এভাবে করে জনসমক্ষে আসতে শুরু করে এই পেশার গুরুত্ব। ভারতেও তাঁরই প্রচেষ্টায় এই পেশার খ্যাতি বাড়তে থাকে। ১৮৮৩ সালে তাঁর এই কাজের জন্য তিনি রয়েল রেডক্রস সম্মান লাভ করেন। একের পর এক সম্মান পান ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল। তারপর ১৮৬০ সালে লন্ডনে বিশ্বে প্রথম তৈরি হয় নার্সিং শেখানোর স্কুল, যে স্কুল নির্মাণে তাঁর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।

Advertisement