চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেছেন, গ্রাম আদালতে সঠিক বিচার না পাওয়ায় ভূক্তভোগীরা উচ্চ আদালতে যেতে বাধ্য হয়। ফলে আদালতে একের পর এক মামলার জট লেগে থাকে। আদালত চাইলেই সহজে মামলা নিষ্পত্তি করতে পারে না। গ্রাম আদালত সক্রিয়করণের ব্যাপারে বর্তমান সরকার সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রান্তিক পর্যায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় মানুষের আস্থার জায়গা গ্রাম আদালত। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমস্যাগুলো গ্রামীন পর্যায়ে নিষ্পত্তি করা গেলে মানুষ উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতো না। গ্রাম আদালতের কার্যক্রম সক্রিয় করতে হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান-মেম্বার ও মহিলা প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্টদেরকে অত্যন্ত নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে।
গতকাল ২০ মে বুধবার চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত ‘জেন্ডার সংবেদনশীল ও অন্তর্ভৃক্তিমূলক গ্রাম আদালত’ বিষয়ক বিভাগীয় কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ইউএনডিপি’র সহযোগিতায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন কর্মশালার আয়োজন করেন।
জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার শাখার সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটগণ, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, নোয়াখালী ও কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলার সরকারী কর্মকর্তা, ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বার, মহিলা প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ কর্মশালায় অংশ নেন।
ডিসি বলেন, নিরপেক্ষ না হলে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ বাস্তবায়ন হবে না। গ্রামের ছোটখাটো সমস্যাগুলোকে বড় করে না দেখে সমাধানকে বড় করে দেখতে হবে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে গ্রাম আদালতকে আরও আধুনিক ও সক্রিয় কওে তুলতে হবে। তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় ডিজিটাল অ্যাপসের মাধ্যমে গ্রাম আদালতের তথ্য হালনাগাদকরণ এবং মামলার অগ্রগতি জানার সুযোগ তৈরী করা এখন সময়ের দাবী। গ্রামীন জনপদে সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে নারীদের জন্য দ্রুত ও সহজ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গ্রাম আদালতের ভূমিকা অপরিসীম।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার শাখার উপপরিচালক ও সরকারের উপসচিব গোলাম মাঈনউদ্দিন হাসানের সভাপতিত্বে ও বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ ৩য় পর্যায় প্রকল্পের ডিস্ট্রিক্ট ম্যানেজার সাজেদুল আনোয়ার ভূঁইয়ার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত কর্মশালায় বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি সফিজুল ইসলাম, জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সহকারী সিভিল জজ সুব্রত দাশ, জেলা পুলিশের হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মোঃ তারেক আজিজ ও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি জাহিদুল করিম কচি। মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউএনডিপি বাংলাদেশের জেন্ডার এনালিস্ট শামীমা আক্তার শাম্মী, বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ইপসা’র সহকারী পরিচালক ও প্রকল্প সমন্বয়কারী ফারহানা ইদ্রিস।
কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি সফিজুল ইসলাম বলেন, গ্রাম আদালতকে জনবান্ধব করতে পারলে মানুষ উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হবে না। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে সহজ, স্বল্প ব্যয় ও দ্রুত বিচারপ্রাপ্তির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মানুষ গ্রাম আদালতের এখতিয়ারভূক্ত মামলাগুলো না বুঝে সরাসরি থানায় দায়ের করেন, যা মূলত ঃ ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতেই নিষ্পত্তিযোগ্য।
কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সহকারী সিভিল জজ সুব্রত দাশ বলেন, ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের মোকদ্দমা ৯০ দিনের মধ্যেই গ্রাম আদালতে নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। কিন্ত গ্রামের মানুষ সচেতন নয় বলেই স্থানীয়ভাবে সংঘটিত ছোট খাটো তুচ্ছ বিষয়গুলো নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়। তাদেরকে বুঝাতে হবে এবং ভূক্তভোগীদের ন্যায় বিচার নিশ্চিতে গ্রাম আদালত পরিচালনা সংশ্লিষ্ট সকলকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে।
কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যেজেলা পুলিশের হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মোঃ তারেক আজিজ বলেন, গ্রামের মানুষ যাতে স্বল্প পরিসরে, স্বল্প খরচে ও স্বল্প সময়ে আইনগত সহায়তা পায় সে লক্ষ্যেই গ্রাম আদালত-এই বার্তা পৌঁছে দিতে এনজিও সংস্থাগুলো এগিয়ে আসলে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম আর পিছিয়ে থাকবে না।
সভাপতির বক্তব্যে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার শাখার উপপরিচালক ও সরকারের উপসচিব গোলাম মাঈনউদ্দিন হাসান বলেন, গ্রাম আদালত নিয়ে মানুষের এখনো অনেক কিছু জানার আছে। প্রান্তিক পর্যায়ের ছোট ছোট বিরোধগুলো স্থানীয়ভাবে নিষ্পত্তি করা গেলে উচ্চ আদালতে বিচারিক চাপ কমতো। গ্রাম আদালতকে আরও জেন্ডার সংবেদনশীল ও সাধারণ মানুষের জন্য অন্তর্ভূক্তিমূলক করতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে কাজ করতে হবে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় ন্যায়বিচার পৌঁছে দেওয়ার এই লক্ষ্যকে সফল করতে সকল অংশীজনকে একযোগে কাজ করার আহবান জানান তিনি।

















