দেশের জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে। সংস্থাটির অধীন ৮টি প্রতিষ্ঠানের সকল কার্যক্রমও নিয়ন্ত্রণ হয় চট্টগ্রাম থেকেই। তবে বিপিসির চেয়ারম্যান থেকে পরিচালক পদমর্যাদা ৫ শীর্ষ কর্মকর্তাদের কেউ চট্টগ্রামে যান না। সংযুক্ত কর্মকর্তাদের নিয়ে তারা রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিটিএমসি ভবনে লিয়াজোঁ অফিসে বসেই দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এতে বিপিসি ও এর অধীনস্থ তেল কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের নিয়মিতভাবে বিভিন্ন সভা, ফাইল অনুমোদন ও দাপ্তরিক সমন্বয়ের জন্য ঢাকায় ছুটতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামে প্রধান কার্যালয় রেখে ঢাকাকেন্দ্রিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি তৈরি হওয়ায় একদিকে যেমন দাপ্তরিক সমন্বয়হীনতা বাড়ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে বিমান ভাড়ায়।
বিপিসির অধীন ইস্টার্ন রিফাইনারি, পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, যমুনা অয়েলসহ আটটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে। দেশের আমদানিকৃত জ্বালানি তেল চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খালাস হয়, পতেঙ্গার স্থাপনাগুলোতে সংরক্ষণ করা হয় এবং সেখান থেকেই দেশব্যাপী সরবরাহ করা হয়। ফলে পুরো জ্বালানি খাতের মূল কার্যক্রম চট্টগ্রামকেন্দ্রিক হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে ঢাকা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বিপিসির শীর্ষ কর্তারা নিয়মিত চট্টগ্রামে অফিস না করায় কার্যত ঢাকাকেন্দ্রিক একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। ফলে বিপিসি ও অধীনস্থ রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের মাসে ৪ থেকে ১০ বার পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম যাতায়াত করতে হয়। বেশিরভাগ সময়ই এই যাতায়াত বিমানে করা হয় এবং প্রতিবার ভাড়া বাবদ ব্যয় হয় ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা।
একেকজন কর্মকর্তার পেছনে মাসে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিমান ভাড়া ব্যয় হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক সময় ঢাকায় বড় সভা থাকলে পুরো বিমানের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যাত্রীই থাকেন তেল কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারী। অথচ হাতে গোনা কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিয়মিত চট্টগ্রামে অফিস করলেই এই বিপুল ব্যয় কমানো সম্ভব ছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির এক কর্মকর্তা বলেন, কর্তা ছাড়া অফিস হলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ নেই। বিপিসি ও অধীনস্থ কোম্পানিগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কর্মকর্তারা অনেক ক্ষেত্রে একে অপরের নির্দেশনা বা মতামত গুরুত্ব দিচ্ছেন না। এতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও কার্যক্রমের গতি দুইই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জানা গেছে, অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা মো. রেজানুর রহমান গত ৫ ফেব্রুয়ারি বিপিসির চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা কারণে দেশে ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে দেশের জ্বালানি খাতে অস্থিরতা তৈরি হয়। মার্চ ও এপ্রিল মাসে পুরোটা সময় দেশের জ্বালানি খাতে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। অথচ এমন সংকটেও সরেজমিন চট্টগ্রামে যাননি তিনি। সবশেষ গত ৬ মে চট্টগ্রাম ভ্রমণে যান এ শীর্ষ কর্মকর্তা। চট্টগ্রামে তার সংক্ষিপ্ত ভ্রমণের সময়সূচি তৈরি হয়। আর ওই সূচি প্রণয়ন করা হয়েছে চট্টগ্রামের প্রধান কার্যালয় থেকে। এটি নিয়ে তেল সেক্টরের কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা হয়।
এছাড়া বিপিসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে পরিচালক (অর্থ) নাজনীন পারভীন গত রমজান মাসে মাত্র একদিনের জন্য চট্টগ্রামে অফিস করেছেন। পরিচালক (বিপণন) মো. সাবেত আলী, পরিচালক (অপারেশন্স) এ কে এম সামছুল হক এবং পরিচালক (পরিকল্পনা) মুহাম্মদ আসাদুল হক গত ৬ ও ৭ মে চট্টগ্রামে অফিস করেছেন।
যদিও বিপিসির চট্টগ্রামে প্রধান কার্যালয়ে চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের জন্য সুপরিসর ও অত্যাধুনিক অফিস কক্ষ বরাদ্দ রয়েছে। সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এসব কক্ষের অধিকাংশই তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন কক্ষগুলো ব্যবহার না হয়ে দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় সেখানে কার্যত প্রশাসনিক স্থবিরতার চিত্র ফুটে উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এসব অবকাঠামো ব্যবহারের পরিবর্তে ঢাকাকেন্দ্রিক অফিস সংস্কৃতি বজায় রাখার কারণে চট্টগ্রামের প্রধান কার্যালয় অনেকটাই আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
এ বিষয়ে বিপিসির অধীনস্থ রাষ্ট্রায়ত্ত একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বলেন, বিপিসির চেয়ারম্যান স্যার থেকে শুরু করে কেউ চট্টগ্রামে আসেন না। নিয়মিত আমাদের কোম্পানির লোকজনকে ফাইল-পত্র নিয়ে ঢাকায় যেতে হয়। অথচ চেয়ারম্যান স্যার এবং পরিচালকরা সপ্তাহে দুয়েকদিন করে চট্টগ্রামে সময় দিলে কাজ অনেক সহজ হত।
উল্টো এখন প্রধান কার্যালয় ঢাকায় নেয়ার আলোচনা
তেল সেক্টরের সবকিছু চট্টগ্রামে হলেও বিপিসি কর্তারা এখন উল্টো প্রধান কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তরের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও এ নিয়ে স্বয়ং বিপিসি ও তার অধীনস্থ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা বিরোধিতা শুরু করেছেন।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, সরকারের বিকেন্দ্রীকরণ নীতির অংশ হিসেবে ১৯৯০ সালের ৪ মার্চ তৎকালীন সরকার বিপিসির প্রধান কার্যালয় ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে স্থানান্তর করা হয়েছিল। কারণ, বিপিসির মূল কার্যক্রম ও এর অধীন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশ কার্যক্রম চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। বর্তমানে বিপিসির প্রধান দায়িত্ব বিদেশ থেকে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা। আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেল ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয় এবং পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের মাধ্যমে দেশব্যাপী সরবরাহ করা হয়।
এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান স্থাপনা চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত। এছাড়া আমদানিকৃত পরিশোধিত জ্বালানি তেলও চট্টগ্রামে সংরক্ষণ করে দেশের বিভিন্ন ডিপোতে পাঠানো হয়। বিপিসির আমদানিকৃত জ্বালানি তেল চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে খালাস করা হয় এবং বিপিসির অধীন আটটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়ও চট্টগ্রামে অবস্থিত। ফলে প্রধান কার্যালয় ঢাকায় সরিয়ে নেয়া হলে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তদারকি জটিল হয়ে পড়বে এবং সার্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এছাড়া মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে বাস্তবায়ন করা হয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প। গভীর সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। একই এলাকায় আধুনিক ট্যাংক টার্মিনাল ও এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণের কার্যক্রমও চলছে। চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ীকেন্দ্রিক এসব অবকাঠামো সরেজমিনে তদারকির জন্য প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে থাকা জরুরি। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম আইন ২০১৬-এর ৫(১) ধারায় বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে থাকবে বলে উল্লেখ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, প্রধান কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তর করা হলে চট্টগ্রামে থাকা বিপিসির মূল্যবান জমি ও স্থাপনা বেহাত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একইসঙ্গে অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান কার্যালয়ও ঢাকায় সরিয়ে নেয়ার চাপ সৃষ্টি হতে পারে, যা সময়সাপেক্ষ ও জটিল প্রক্রিয়া। অতীতেও কয়েকবার বিপিসির প্রধান কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
এদিকে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ বিধি অনুসারে ১২ মে ২০২৬ তারিখে কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী সংসদে একটি নোটিশ দেন। সেখানে তিনি জনস্বার্থে বিপিসির প্রধান কার্যালয় পুনরায় ঢাকায় স্থানান্তর এবং সেখানে স্বতন্ত্র ভবন নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ওই নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে মতামত চাওয়া হয়। এরপর থেকেই বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে এবং চট্টগ্রামে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
চট্টগ্রামে নিজস্ব ভবন নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে
দীর্ঘদিন ধরে বিপিসির কার্যক্রম শিপিং কর্পোরেশনের ভবনে ভাড়ায় চলছে। তবে চট্টগ্রাম নগরের জয়পাহাড়ে বিপিসির প্রধান কার্যালয়ের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। এর আগে সেখানে ২০ তলা নান্দনিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। ২০২১ সালে তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের আপত্তির মুখে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেখানে আবারও প্রধান কার্যালয়ের জন্য প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে ছয়তলা স্থায়ী ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে বিপিসির জানতে বিপিসির চেয়ারম্যানকে কয়েকদিন ধরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। আর সংস্থাটির সচিব শাহিনা সুলতানার সঙ্গে তার কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, দেশের জ্বালানি খাতের প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম হলেও বিপিসির কয়েকজন ‘রাজাদের’ ঢাকায় বসে কার্যক্রম পরিচালনা করাটা অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে করে অধীনস্থ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের ছোটখাটো কাজেও ঢাকায় যেতে হচ্ছে। তাদের যাতায়াতে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হচ্ছে। যে দেশের সাধারণ মানুষ স্বল্পমূল্যে টিসিবির পণ্য কিনতে ট্রাকের পেছনে দৌড়ায়, সে দেশের কর্তাদের এমন বিলাসিতা কাম্য নয়। আবার কর্তাদের অনুপস্থিতিতে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমও দুর্বল হয়ে পড়ছে। যেখানে তেল খালাস, সংরক্ষণ, পরিশোধন ও সরবরাহের পুরো অবকাঠামো চট্টগ্রামকেন্দ্রিক, সেখানে বিপিসির শীর্ষ কর্তাদের ঢাকায় বসে কার্যক্রম চালানোটা একেবারে অযৌক্তিক।
তিনি আরও বলেন, এখন আবার তাদের সুবিধার জন্য বিপিসির কার্যালয় ঢাকায় নেওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এটি সরকারের বিকেন্দ্রীকরণ নীতিরও পরিপন্থি। দ্রুত শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়মিত চট্টগ্রামে অফিস নিশ্চিত এবং প্রধান কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তরের যেকোনো উদ্যোগ থেকে সরে আসার দাবি জানাচ্ছি। তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, এখন আসলে দাবি কাদের জানাব। সবাই তো ভোগবিলাসে ব্যস্ত। তাদের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা কর্তারাও দেখবেন আরও দুর্নীতিগ্রস্থ।

















