রেকর্ড বৃষ্টিপাতে জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে তৎপর চসিক মেয়র, ১০১ সদস্যের র‌্যাপিড রেসপন্স টিম গঠন

30

চট্টগ্রামে চলতি মৌসুমের ২৪ ঘণ্টায় ৩৮৬.৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা গত ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতের মধ্যেও জলাবদ্ধতায় জনভোগান্তি কমাতে মাঠে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

Advertisement

মঙ্গলবার তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা, কাতালগঞ্জ, টাইগারপাস, পাঁচলাইশসহ বিভিন্ন জলাবদ্ধতাপ্রবণ ও পাহাড়ঘেঁষা এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।

পরিদর্শনকালে মেয়র বলেন, “চট্টগ্রামে মৌসুমের রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। এই বৃষ্টির কারণে যাতে নগরবাসী দীর্ঘসময় জলাবদ্ধতার দুর্ভোগে না পড়েন, সে লক্ষ্যে আমরা বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছি। আমি নিজে মাঠে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।”

তিনি বলেন, বর্তমানে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং এর সুফল ইতোমধ্যে নগরবাসী পাচ্ছেন। তবে অবশিষ্ট প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ, বিশেষ করে হিজড়া খাল, জামালখান খাল ও গুলজার খালের কাজ শেষ না হওয়ায় কয়েকটি এলাকায় এখনও জলাবদ্ধতার সমস্যা রয়ে গেছে।

মেয়র জানান, কাতালগঞ্জ ও পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার পানি মূলত হিজড়া খাল দিয়ে নিষ্কাশিত হয়। কিন্তু এলাকাটি ভৌগোলিকভাবে নিচু হওয়ায় ভারী বর্ষণে সাময়িকভাবে পানি জমে যায়। তবে বৃষ্টি বন্ধ হওয়ার পর সাধারণত এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যেই পানি নেমে যায়।

তিনি বলেন, হিজড়া খালের কাজ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেড বাস্তবায়ন করছে। বর্ষা শুরুর আগে কাজের একটি অংশ স্থগিত রাখতে হয়েছে। বর্ষা শেষে কাজ শেষ হলে এই এলাকার জলাবদ্ধতার সমস্যাও অনেকাংশে দূর হবে।

ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, নগরীর বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, মির্জাপুর, বৃহত্তর বাকলিয়া, চকবাজার, কোতোয়ালী, দেওয়ানহাট, লালখান বাজার, আকবরশাহ, হালিশহর ও বন্দর এলাকায় এবার উল্লেখযোগ্য জলাবদ্ধতা দেখা যায়নি, যা চলমান উন্নয়নকাজের ইতিবাচক ফলাফল।

তিনি আরও বলেন, আগ্রাবাদ কমার্স কলেজের সামনে গুলজার খালের কিছু কাজ এখনও চলমান রয়েছে। সেটিও শেষ হলে আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকাতেও জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

মেয়র বলেন, “আমরা বলেছিলাম ৭০ শতাংশ জলাবদ্ধতা কমবে। আজকের পরিস্থিতি সেই বাস্তবতারই প্রমাণ। অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ সমস্যার সমাধানও চলমান প্রকল্পগুলো শেষ হলে সম্ভব হবে। এছাড়া ৪০টি খালের উন্নয়নে নতুন ডিপিপি বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে বলে আমরা আশা করছি।”

পরিদর্শনকালে ভারী বর্ষণে লালখান বাজার এলাকায় কয়েকটি বড় গাছ উপড়ে পড়া এবং এয়ারপোর্ট রোডের একটি অংশ ধসে যাওয়ার বিষয়েও দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন মেয়র।

পাঁচলাইশ-কাতালগঞ্জ এলাকায় যত্রতত্র বর্জ্য ফেলার কারণে জলাবদ্ধতা আরও প্রকট হচ্ছে উল্লেখ করে মেয়র বলেন, কিছু ক্লাব, কমিউনিটি সেন্টার ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান অনুষ্ঠান শেষে ব্যবহৃত ককশিট, প্লাস্টিক ও অন্যান্য অপচনশীল বর্জ্য নালা-নর্দমায় ফেলে দিচ্ছে। এসব বর্জ্য পানিতে না মিশে ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

তিনি বলেন, নালা পরিষ্কারের সময় টুকরিভর্তি পলিথিন, প্লাস্টিক ও ককশিট পাওয়া গেছে। এগুলো পানি চলাচলে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। যারা এভাবে বর্জ্য ফেলছে, তাদের বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করা হবে এবং আইন অনুযায়ী জরিমানা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মেয়র নগরবাসীকেও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নই নয়, নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পতেঙ্গা কেন্দ্রের তথ্যমতে, মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ৩৮৬.৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ। একই সময়ে আমবাগান আবহাওয়া অফিসে ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।

১০১ সদস্যের র‌্যাপিড রেসপন্স টিম গঠন

পরিদর্শন শেষে টাইগারপাসস্থ চসিক কার্যালয়ে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন মেয়র।

সভায় দুর্যোগকালীন জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন-রেড ক্রিসেন্টের ১০১ সদস্যবিশিষ্ট র‌্যাপিড রেসপন্স টিম গঠনের ঘোষণা দেন তিনি।

এ কমিটিতে চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিনকে আহ্বায়ক এবং চট্টগ্রাম সিটি রেড ক্রিসেন্টের সেক্রেটারি গোলাম বাকি মাসুদকে সদস্যসচিব করা হয়েছে।

মেয়র বলেন, “আমরা রেড ক্রিসেন্টের ভলান্টিয়ারদের সহযোগিতায় একটি সার্বক্ষণিক মনিটরিং সেল গঠন করেছি। যেকোনো দুর্যোগ বা জরুরি পরিস্থিতিতে এই র‌্যাপিড রেসপন্স টিম তাৎক্ষণিকভাবে মাঠে কাজ করবে।”

এ সময় রেড ক্রিসেন্টের পক্ষ থেকে নগরবাসীকে যেকোনো জরুরি সহযোগিতার জন্য ০১৮০৫-৭৮৩৩৮৯ নম্বরে যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হয়।

টানা বর্ষণের ফলে পাহাড়ধসের আশঙ্কা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন পাহাড়ঘেঁষা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করেন মেয়র। এ সময় তিনি বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে বা নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার অনুরোধ জানান। একই সঙ্গে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি জোরদার এবং প্রয়োজনে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।

Advertisement