চট্টগ্রাম নগরে সকাল থেকে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির বাধা উপেক্ষা করে টানা ছয় ঘণ্টা গ্যাসের ফিলিং স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সিএনজি অটোরিকশার চালক মোহাম্মদ মঞ্জুর (৪০)। ফিরিঙ্গী বাজার থেকে ট্রাফিকের দীর্ঘ সারি অতিক্রম করে যখন কর্ণফুলী প্রাকৃতিক গ্যাস লিমিটেডের দিকে এগোচ্ছিলেন, আশা ছিল দ্রুত গ্যাস নিয়ে ট্রিপে বের হবেন। কিন্তু শত শত গাড়ির সেই দীর্ঘ লাইন ইঞ্চি পরিমাণও নড়ছে না।
গাড়ির ছাদে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দের সঙ্গে মনখারাপের সুর মিলিয়ে মঞ্জুর আক্ষেপ করে বলেন, সকাল ৬টায় এসে লাইনে দাঁড়াইছি। এখন দুপুর ১২টা বাজে। শুরুতে নাকি অল্প গ্যাস ছিল, এখন চাপ একেবারেই নাই, পাম্পও বন্ধ। দিনটাই শেষ, কীভাবে গাড়ি চালাব জানি না।
গত কয়েক দিন ধরে পুরো চট্টগ্রাম নগরের পথঘাট, শিল্পাঞ্চল আর রান্নাঘরে গ্যাসের জন্য হাহাকারের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, মঞ্জুর যেন তারই প্রতীক। একদিকে গ্যাস সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে পরিবহন ও শিল্পকারখানা, অন্যদিকে দফায় দফায় বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে নাকাল অবস্থা বন্দরনগরীর বাসিন্দাদের।
পথেই কাটছে পুরো দিন, সুযোগ নিচ্ছেন চালকেরা!
নগরের কোতোয়ালী, জিইসি মোড় কিংবা কর্ণফুলীর মইজ্জ্যারটেক এলাকার সিএনজি স্টেশনগুলোর চিত্র হুবহু এক। দিন গড়িয়ে রাত নামলেও সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মিনিবাসের লাইন শেষ হয় না।
স্টেশন মালিকরা জানিয়েছেন, জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ লাইনে গ্যাসের চাপ বা প্রেসার মারাত্মকভাবে কমে গেছে। চাপ যখনই সামান্য বাড়ে, তখনই পাম্প চালু করা হয়, আবার কমে গেলে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন তারা।
সড়কে এই জটলা আর জ্বালানি সংকটের কারণে অধিকাংশ গণপরিবহন এখন গ্যারেজে বসা। আর এই সুযোগটাকেই হাতিয়ার বানিয়েছেন একশ্রেণীর চালক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। নগরীর ব্যস্ততম মোড়গুলোতে যানবাহন না পেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকছেন অফিসগামী ও সাধারণ যাত্রীরা। কোনো মতে কোনো সিএনজি অটোরিকশা কিংবা রিকশার দেখা মিললেও গুনতে হচ্ছে সাধারণ সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ ভাড়া।
এনজিওতে কর্মরত মোহাম্মদ জাহেদ হোসেন (৪০) বলেন, সকাল ১০টায় অফিসে পৌঁছানোর কথা, অথচ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও কোনো বাসের দেখা নেই। যেগুলো আসছে, সেগুলোতে ওঠার মতো অবস্থা নেই, মানুষ দরজায় ঝুলছে। বাধ্য হয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করতে গেলাম, কিন্তু অন্য দিনে যেখানে বহদ্দারহাট থেকে আগ্রাবাদ ১০০ থেকে ১২০ টাকা ভাড়া হতো, চালকেরা সরাসরি এখন ৩০০ টাকা দাবি করছেন। এই সুযোগসন্ধানী চালকদের কাছে আমরা জিম্মি হয়ে পড়েছি।
নগরের মুরাদপুর থেকে কোতোয়ালি যাচ্ছিলেন স্কুলশিক্ষিকা ও অভিভাবক শারমিন সুলতানা। তিনি বলেন, আমার সঙ্গে ছোট বাচ্চা রয়েছে, তাকে নিয়ে স্কুলের উদ্দেশ্যে বের হয়েছি। সিএনজি পাওয়া যাচ্ছে না, আর যে দু-একটা খালি গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে, ভাড়া শুনে মনে হচ্ছে আমরা কোনো দূরপাল্লার বাসে উঠছি। গ্যাস নাই বুঝলাম, কিন্তু তার দায় কেন সাধারণ মানুষকে এভাবে বাড়তি ভাড়া গুনে মেটাতে হবে, প্রশ্ন রাখেন তিনি।
কোতোয়ালি এলাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সাইফুল আলম (৫০) বলেন, ব্যবসার মালপত্র নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রায় ১৫ মিনিট অপেক্ষার পর একটি সিএনজি অটোরিকশা পেয়েছি। চালক মোড় ঘুরতেই দ্বিগুণ ভাড়া চেয়ে বসলেন। প্রতিবাদ করায় চালক বললেন, ভাই, সাত ঘণ্টা পাম্পের লাইনে দাঁড়িয়ে যে সময় নষ্ট করেছি, সেই টাকা কে দেবে?
নগরের ৩ নম্বর রুটের মিনিবাস চালক মো. হেলাল উদ্দীনের গলায় ক্ষোভ আর আক্ষেপ দুটোই স্পষ্ট। এই চালক বলেন, দেখেন, গ্যাসের দাম তো নতুন করে বাড়ে নাই। আমরাও বাড়তি টাকা পেতে চাই না। কিন্তু সমস্যা হলো, একটি ট্রিপ দেওয়ার আগে সাত থেকে আট ঘণ্টা পাম্পে বসে থাকতে হয়। যে সময়ে তিন থেকে চারটা ট্রিপ দিতে পারতাম, সেই সময়টা পাম্পের লাইনে গেলে পেটে তো টান পড়ে। গাড়ি চালিয়ে ডাল-ভাত তো খাওয়া লাগবে, নাকি।
একই সুরে কথা বললেন আরেক অটোরিকশাচালক মো. জামশেদ আলম। স্বাভাবিক সময়ে ১২ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে যে আয় হতো, এখন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গ্যাসের পেছনেই চলে যাওয়ায় দৈনন্দিন জীবনের খরচ মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি।
রান্নাঘর থেকে কারখানা, সর্বত্রই ‘হাঁসফাঁস’ অবস্থা!
জ্বালানি সংকটের ঢেউ কেবল সড়কের চাকা থামিয়ে ক্ষান্ত হয়নি, তা আছড়ে পড়েছে সাধারণ রান্নাঘর থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের বৃহৎ শিল্পাঞ্চলগুলোতেও।
নগরের আকবরশাহ এলাকার বাসিন্দা আয়শা আক্তার বলেন, সকাল হলেই মনে হয় রান্নাঘরের সব প্রাণ উবে যায়। নিভু নিভু করে চুলা জ্বলে, কখনো একদমই থাকে না। বাধ্য হয়ে বিকল্প উপায়ে রান্না করতে হয়। তার ওপর দিনে ১০ বারের বেশি বিদ্যুৎ যায়। একবার গেলে দুই ঘণ্টার আগে আসার নাম নেই। আমরা তো একপ্রকার হাঁপিয়ে উঠেছি।
অন্য এলাকাগুলোর অবস্থাও ভিন্ন নয়। মুরাদপুরের গৃহিণী কুলসম আক্তার জানান, গ্যাস না থাকায় বাধ্য হয়ে বাড়তি টাকা খরচ করে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে সিলিন্ডারের এই নতুন খরচ পুরো সংসারের বাজেটে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
অন্যদিকে, চট্টগ্রামের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত শিল্পকারখানাগুলো এখন গভীর মন্দার মুখোমুখি। চট্টগ্রাম অঞ্চলে রড উৎপাদন কারখানা, পোশাক শিল্প, জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ড এবং স্টিল স্ট্রাকচার কারখানায় গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন নেমে এসেছে ৪০ শতাংশে।
দেশের অন্যতম বড় ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএমের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর তপন সেনগুপ্ত বাস্তব চিত্রটি তুলে ধরে বলেন, গত প্রায় বিশ দিন ধরে আমরা কাঙ্ক্ষিত হারে গ্যাস পাচ্ছি না। সংকট এতটাই তীব্র হয়েছে যে কারখানা পুরোপুরি চালু রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দৈনিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার ৮০ শতাংশও পূরণ করা যাচ্ছিল না, যার কারণে বিপুল লোকসানের মুখ দেখতে হচ্ছে। গ্যাস না থাকলে কারখানা চালু রাখা একরকম অসম্ভব।
উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর অবস্থাও করুণ। রাউজান ও আনোয়ারা এলাকার একাধিক ২১০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট এখন সম্পূর্ণ বন্ধ। ২২৫ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে দৈনিক ৩৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২৮ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে পুরো চট্টগ্রামজুড়ে বিদ্যুতের এক নজিরবিহীন ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) উৎপাদন বিভাগের জেনারেল ম্যানজার উত্তম চৌধুরী বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে সরকারি নির্দেশনায় গত ৪ মার্চ থেকে প্রায় ৫ মাস ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কেজিডিসিএল থেকে যে পরিমাণ গ্যাস দেওয়া হচ্ছে, তা দিয়ে কারখানা চালু রাখা বরাবরই অসম্ভব। কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা দীর্ঘায়িত হলে দেশের কৃষি খাতে সার সরবরাহে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
কেন এই হঠাৎ বিপর্যয়?
চট্টগ্রাম অঞ্চলের গ্যাসের সিংহভাগ চাহিদাই নির্ভর করে বঙ্গোপসাগরের মহেশখালীতে অবস্থিত দুটি ভাসমান এলএনজি (লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস) টার্মিনালের ওপর। দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রের সরবরাহ দিয়ে চট্টগ্রামের এই সুনির্দিষ্ট পরিকাঠামোগত চাহিদা সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। মহেশখালীতে মার্কিন প্রতিষ্ঠান ‘এক্সিলারেট এনার্জি’ এবং দেশের ‘সামিট গ্রুপ’ পরিচালিত দুটি ভাসমান টার্মিনাল জাতীয় গ্রিডে স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক প্রায় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করে থাকে।
কিন্তু বিপত্তি ঘটে গত ২১ জুলাই। সেদিন মার্কিন প্রতিষ্ঠান ‘এক্সিলারেট এনার্জি’র ভাসমান টার্মিনালে হঠাৎ অগ্নিকাণ্ডের পর যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রোমানিয়া ও সিঙ্গাপুরের কারিগরি বিশেষজ্ঞদের একটি যৌথ দল তা মেরামতের উদ্যোগ নেয়। দীর্ঘ প্রচেষ্টা শেষে গত ৬ আগস্ট টার্মিনালটি আংশিক সচল হয়। তবে চাপ স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়নি।
এক সংকট কাটিয়ে ওঠার আগেই শুরু হয় দ্বিতীয় সংকট, প্রকৃতির রূপ পরিবর্তন। সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর বৈরী আবহাওয়া ও প্রবল উত্তাল ঢেউয়ের কারণে সিঙ্গাপুর থেকে এলএনজিবাহী নতুন কার্গো জাহাজ এলেও, তা টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত বা সেটআপ করা সম্ভব হচ্ছে না।
রাষ্ট্রায়ত্ত রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মুহাম্মদ নাছির উদ্দিন জানান, বর্তমানে বিদেশ থেকে আমদানি করা এলএনজিবাহী জাহাজ সাগরের প্রচণ্ড উত্তাল পরিস্থিতির কারণে পাইপলাইনের সঙ্গে সংযুক্ত করা যাচ্ছে না। ফলে প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ অন্তত ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে গেছে। কার্গো সেটআপের কাজ আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করছে। সাগর কিছুটা শান্ত হলে এক-দুই দিনের মধ্যে এর সমাধান হতে পারে।
চাহিদা ও বরাদ্দের বিশাল ফারাক!
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চট্টগ্রাম অঞ্চলের চাহিদা ও যোগানের মাঝে বড় ধরনের গ্যাপ তৈরি হয়েছে।
কেজিডিসিএল সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে দৈনিক প্রকৃত গ্যাসের চাহিদা সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে স্বাভাবিক সময়ে বরাদ্দ মিলত মাত্র ২৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট। সাম্প্রতিক সংকটের কারণে এই সরবরাহ আরও কমে দাঁড়িয়েছে দিনে মাত্র ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুটে। ফলে চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তির হিসাব মেলালে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বর্তমানে প্রায় ৪৫ দশমিক ৭১ শতাংশ গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে।
কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (বিতরণ উত্তর) প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিক খান বলেন, বরাদ্দ কমে যাওয়ায় বিতরণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে সংযোগ বজায় রাখতে। তবে জাতীয় গ্রিড থেকে যতক্ষণ না সরবরাহ বাড়ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহরের এই সংকট পুরোপুরি দূর করা কঠিন।
সমাধান কোন পথে?
জাতীয় স্তরে গ্যাসের দৈনিক মোট চাহিদা প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ঘনফুট। অথচ দেশের সবকটি ক্ষেত্র মিলে সরবরাহ করা সম্ভব হয় সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ঘনফুট। যার একটি বিশাল অংশ, প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ঘনফুট আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। মহেশখালীর সামিট টার্মিনাল একা কিছুটা অতিরিক্ত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ করার চেষ্টা করলেও, তা চাহিদার তুলনায় সাগরে এক ফোঁটা পানির মতো।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ীদের মতে, সমুদ্রের আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া এবং আমদানি করা এলএনজি খালাস প্রক্রিয়া পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত এই ভোগান্তি থেকে চট্টগ্রামের মানুষের তাৎক্ষণিক মুক্তির সম্ভাবনা কম।

















