চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি জাহাজ ভাঙা কারখানায় লিক হওয়া বিষাক্ত গ্যাসে নিহতের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ঘটনাস্থলে ৩ জনের পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ৬ জন মারা গেছেন। এ নিয়ে মোট ৮ শ্রমিক মারা গেলেন। ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড নামে ওই কারখানায় শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে এই ঘটনা ঘটেছে।
ইয়ার্ডে একটি জাহাজে হাউসকিপিংয়ের কাজ করার সময় গ্যাস লিক হয়েছে বলে জানা যায়। এতে অসুস্থ হয়ে পড়া শ্রমিকদের পাঠানো হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ (চমেক) আশপাশের নানা হাসপাতালে।
ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ডে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফেরদৌস ওয়াহিদ জানান, ঘটনাস্থালেই তিনজন মারা গেছেন। এ সময় আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন। আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা আল মামুন প্রথমে ঘটনাস্থলে তিনজনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছেন। পরে আরও ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন তিনি। চমেক হাসপাতালে আনার পর মারা গেছেন তারা। অসুস্থ হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১০ থেকে ১৫ জন।
নিহত ৯ জনের মধ্যে চারজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন, সানি জলদাস (২২), পলাশ জলদাস (২৭) এবং দুই ভাই মনসুর আলী (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮)। তাদের সবার বাড়ি সীতাকুন্ড উপজেলার ভাটিয়ারিতে। বাকিদের পরিচয় পাওয়া যায়নি।
ঘটনার খবর পেয়ে চমেক হাসপাতালে এসেছেন ভাটিয়ারী এলাকার মো. মহিউদ্দিন। বোনজামাই মনছুরের খোঁজে এসে পান তার মৃতদেহ। তিনিই জানান, মনছুরের ছোট ভাই নাছিরও গ্যাসের বিষক্রিয়ায় মারা গেছেন।
‘সকাল ৭ টায় দুই ভাই ঘর থেকে বের হয়ে কাজে যায়। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে দুর্ঘটনার খবর আসে। ততক্ষণে সব শেষ। আমার বোনের দুই মেয়ে। এখম তারা কীভাবে চলবে জানি না’- বলছিলেন মনছুর।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মাহবুবুল হাসান বলেছেন, ‘আমরা ১০ জন শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার খবর পেয়েছি। তাদের মধ্যে কয়েকজন মারা গেছে শুনেছি।’
ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ডের ম্যানেজার মোহাম্মদ ইউসুফ অবশ্য জানান, হতাহতদের অনেকে শ্রমিক নন, উৎসুক জনতা। তিনি বলেন, শুক্রবার ইয়ার্ড বন্ধ ছিল। সকাল ১০টার দিকে একটি স্ক্র্যাপ এলএনজি জাহাজের ট্যাংকে লিকেজ হয়। স্থানীয় অনেকে বিষয়টি দেখতে গেলে গ্যাসে আক্রান্ত হন।
ইয়ার্ডের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাইফুজ্জামান বলেন, এখানে বিস্ফোরণের কোনো ঘটনা ঘটেনি। গ্যাস লিক হয়ে বিষক্রিয়ায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। কয়েকজন অসুস্থ হয়েছেন। অনেকে প্রথমে এটিকে বিস্ফোরণ বলে মনে করেছিলেন।
চট্টগ্রাম পুলিশ সুপার (এসপি) মাহমুদা বেগমও বলেন, বিস্ফোরণের খবর সঠিক নয়।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মাহবুবুল হাসান বলেন, ১০ শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন মারা গেছেন। বাকিদের সর্বশেষ অবস্থা এখনো জানা যায়নি। গ্যাস নির্গমন নাকি বিস্ফোরণ, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি ইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, তাও তদন্ত করা হচ্ছে।
সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ডগুলোতে মূলত পরিত্যক্ত জাহাজ ভেঙে-কেটে রড তৈরির লোহা সংগ্রহ করা হয়ে থাকে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরেই অনিরাপদ কর্মপরিবেশের অভিযোগ রয়েছে। বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ডগুলোতে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় অন্তত তিনজন শ্রমিক নিহত এবং ৩৮ জন আহত হয়েছিলেন।















