চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৫ হাজার ১৬৭ জন, মৃত্যু ২১ জনের; সেপ্টেম্বরে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৪৩০ রোগী শনাক্ত

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে, ৯ মাসেই ছাড়াল গত বছরের মোট আক্রান্ত

26

তৌহিদুল ইসলাম, চট্টলা নিউজ ডেস্ক: চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাস এবং অক্টোবরের প্রথম আট দিনের হিসাব মিলিয়ে জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৬৭ জনে। এ সময়ে মারা গেছেন ২১ জন। আক্রান্তের এই সংখ্যা ২০২৫ সালের পুরো বছরের মোট আক্রান্তের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। গত বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৪ হাজার ৮৬৪ জন এবং মারা গিয়েছিলেন ২৭ জন।

Advertisement

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের গত ৮ অক্টোবর প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৫ হাজার ১৬৭ জন। এর মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৪৩০ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। আগস্টে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ হাজার ২০২ জন। অর্থাৎ, এক মাসের ব্যবধানে সেপ্টেম্বরে আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, অক্টোবরের প্রথম আট দিনে আক্রান্ত হয়েছেন ৭০১ জন। মাসের বাকি দিনগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তা এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই সঙ্গে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ২১-এ পৌঁছানো জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক।

মাসভিত্তিক আক্রান্ত ও মৃত্যুর চিত্র

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের বছরভিত্তিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও জুলাই থেকে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে।

জানুয়ারিতে ৬৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২২ জন, মার্চে ২০ জন, এপ্রিলে ২৯ জন, মে মাসে ৩৭ জন এবং জুনে ১২২ জন আক্রান্ত হন। জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩৬ জনে। আগস্টে তা বেড়ে হয় ১ হাজার ২০২ জন এবং সেপ্টেম্বরে ২ হাজার ৪৩০ জন। অক্টোবরের প্রথম আট দিনে আক্রান্ত হয়েছেন আরও ৭০১ জন।

মৃত্যুর পরিসংখ্যানেও সেপ্টেম্বর মাসে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। জানুয়ারিতে একজনেরও মৃত্যু হয়নি। ফেব্রুয়ারিতে একজন, জুলাইয়ে দুজন, আগস্টে দুজন এবং সেপ্টেম্বরে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। মার্চ, এপ্রিল, মে, জুন ও অক্টোবরের ৮ তারিখ পর্যন্ত প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী নতুন কোনো মৃত্যুর তথ্য নেই। সব মিলিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ২১।

গত পাঁচ বছরের তুলনায় পরিস্থিতি

বছরভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৫ হাজার ৪৪৫ জন এবং মারা গিয়েছিলেন ৪১ জন। ২০২৩ সালে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৮৭ জনে; মৃত্যু হয় ১০৭ জনের। ২০২৪ সালে আক্রান্ত হন ৪ হাজার ৩২৩ জন এবং মারা যান ৪৫ জন। ২০২৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৮৬৪ এবং মৃত্যু ২৭ জন।

অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৫ হাজার ১৬৭ এবং মৃত্যু ২১ জন। অর্থাৎ, অক্টোবরের প্রথম আট দিনেই চলতি বছরের আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের পূর্ণ বছরের তুলনায় ৩০৩ জন বেশি হয়েছে। যদিও ২০২৩ সালের তুলনায় এ বছরের আক্রান্তের সংখ্যা এখনো কম, তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সংক্রমণের দ্রুত বৃদ্ধি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

মহানগর ও উপজেলায় আক্রান্তের হিসাব

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ৮ অক্টোবরের প্রতিবেদনে আক্রান্তদের অবস্থানভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৪৩০ জন। বিভিন্ন উপজেলায় আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ১৮৭ জন। এ ছাড়া অন্যান্য জেলা থেকে আসা বা সংশ্লিষ্ট শ্রেণিতে নথিভুক্ত রোগীর সংখ্যা ৫৫০ জন। সব মিলিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৫ হাজার ১৬৭।

মহানগর ও উপজেলাভিত্তিক তথ্য থেকে বোঝা যায়, ডেঙ্গু সংক্রমণ শুধু নগরকেন্দ্রিক নয়; জেলার বিভিন্ন উপজেলাতেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী শনাক্ত হয়েছেন।

উপজেলাভিত্তিক আক্রান্তের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে সীতাকুণ্ড। এ উপজেলায় আক্রান্ত হয়েছেন ৬৬৮ জন। এরপর কর্ণফুলীতে ২৮৯ জন, বাঁশখালীতে ১৬৩ জন, রাঙ্গুনিয়ায় ১৫৫ জন, সাতকানিয়ায় ১২৪ জন, আনোয়ারায় ১১৫ জন, পটিয়ায় ১০৬ জন এবং রাজানে ১০৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

এ ছাড়া হাটহাজারীতে ৮৪ জন, মিরসরাইয়ে ৮০ জন, বোয়ালখালীতে ৭৬ জন, চন্দনাইশে ৭৭ জন, লোহাগাড়ায় ৬৮ জন, ফটিকছড়িতে ৫০ জন এবং সন্দ্বীপে ২৭ জন আক্রান্ত হয়েছেন। উপজেলা পর্যায়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ১৮৭।

নারী ও শিশু আক্রান্তের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য

লিঙ্গ ও বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরে আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ২ হাজার ৪৮৯ জন, নারী ১ হাজার ৪৯৭ জন এবং শিশু ১ হাজার ১৮১ জন। অর্থাৎ, আক্রান্তদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।

৮ অক্টোবরের প্রতিবেদনে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৭২ জন। তাঁদের মধ্যে পুরুষ ২৩ জন, নারী ৩১ জন এবং শিশু ১৮ জন। একই প্রতিবেদনের মৃত্যু-সংক্রান্ত সারসংক্ষেপে দেখা যায়, এ বছর ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ২১ জনের মধ্যে চারজন পুরুষ, ১১ জন নারী এবং ছয়জন শিশু।

নারী ও শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুর হিসাবও ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিবার ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

২৪ ঘণ্টায় নতুন আক্রান্ত ৭২ জন

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের দৈনিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮ অক্টোবরের আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে নতুন করে ৭২ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৮ জন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেসে (বিআইটিআইডি) ১৫ জন, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ১১ জন, চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) দুজন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুজন এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ১৪ জন শনাক্ত হয়েছেন।

একই সময়ে ডেঙ্গুতে নতুন কোনো মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে চলতি বছরের শুরু থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে ৪ হাজার ২৪০ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৯২৭ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। সব মিলিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন ৫ হাজার ১৬৭ জন। এ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২০৮ জন এবং ছাড়পত্র পেয়েছেন ৪ হাজার ৯৫৯ জন।

প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা জুলাই থেকে দ্রুত বাড়তে শুরু করে এবং সেপ্টেম্বরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। অক্টোবরের প্রথম আট দিনেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী শনাক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বাড়ির আশপাশ, ছাদ, বারান্দা, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র ও অন্যান্য স্থানে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করা জরুরি। ফুলের টব, ড্রাম, বালতি, পানির ট্যাংক এবং অব্যবহৃত পাত্রে পানি জমতে না দেওয়া, পানির পাত্র ঢেকে রাখা এবং মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল পরিষ্কার রাখার বিষয়ে নাগরিকদের সচেতন থাকতে হবে।

একই সঙ্গে সিটি করপোরেশন, স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন ও নাগরিকদের সমন্বিতভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। জ্বরসহ ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ৮ অক্টোবর প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের আক্রান্তের সংখ্যা ইতোমধ্যে গত বছরের মোট সংখ্যাকে ছাড়িয়েছে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন জরুরি।

Advertisement