জাতীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সমিতি, বাংলাদেশ (নাসিব)-এর কেন্দ্রীয় নির্বাচন-২০২৬কে সামনে রেখে নির্বাচন-সংক্রান্ত কার্যক্রম অবহিতকরণ ও মতবিনিময় সভায় নির্বাচন পদ্ধতি, সদস্যপদ ফি, ভোটার তালিকা ও নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। সভায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত নেতারা দ্রুত, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের পাশাপাশি সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে আগের নিয়মে নির্বাচন পরিচালনা এবং সদস্য নবায়ন ফি পূর্বের মতো রাখার দাবি জানান।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম হলে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ও নাসিবের প্রশাসক মোছা. নারগিস মুরশিদা। এতে দেশের ৬৪ জেলার সভাপতি, পরিচালক, প্রতিনিধি ও সদস্যরা অংশ নেন।
সভার শুরুতে নাসিবের কেন্দ্রীয় নির্বাচন উপলক্ষে ভোটার তালিকা হালনাগাদের অগ্রগতি, নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি, সম্ভাব্য সময়সূচি এবং নির্বাচন-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে সদস্যদের অবহিত করা হয়। একই সঙ্গে ভোটার তালিকা চূড়ান্তকরণ, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা, মনোনয়নপত্র সংগ্রহ, জমা ও যাচাই-বাছাইসহ সব কার্যক্রম স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সভাপতির বক্তব্যে প্রশাসক নারগিস মুরশিদা বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য একটি সুন্দর, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়া। দায়িত্ব গ্রহণের পর দেখেছি নাসিবের নিজস্ব কোনো স্থায়ী কার্যালয় নেই। বিষয়টি নিয়েও আমরা কাজ করছি।”
তিনি আরও বলেন, এবারের নির্বাচন প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। তবে একটি গ্রহণযোগ্য ভোটের জন্য সঠিক ও হালনাগাদ সদস্য তালিকা নিশ্চিত করা প্রয়োজন এবং সে লক্ষ্যে কাজ অনেক দূর এগিয়েছে।
সভায় নির্বাচন পরিচালনা বোর্ডের সভাপতি মোহাম্মদ জাকির হোসেন জানান, পূর্বে নির্বাচনের ছয় মাস আগে সদস্য হওয়া ব্যক্তিরা ভোট দিতে পারতেন, এবার সেই সময়সীমা চার মাস করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তিনি আগামী ২১ নভেম্বর কেন্দ্রীয় নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তাবও তুলে ধরেন।
তবে আলোচনা পর্বে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত সভাপতি, পরিচালক ও সদস্যরা নির্বাচন পরিচালনা বোর্ডের প্রস্তাবিত প্রত্যক্ষ ভোট পদ্ধতির বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেন। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পদ্ধতি অনুযায়ী প্রতিটি জেলা থেকে তিনজন প্রতিনিধি নির্বাচনে অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় ৩১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হোক। পরে সেই কমিটির মাধ্যমেই কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি নির্বাচিত করা হলে সংগঠনের ঐতিহ্য ও ভারসাম্য বজায় থাকবে।
সদস্যরা আরও বলেন, নাসিব মূলত অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প উদ্যোক্তাদের সংগঠন। নতুন বাণিজ্য সংঘ অধ্যাদেশ-২০২৫ অনুযায়ী নতুন সদস্য হতে ২০ হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করায় প্রান্তিক উদ্যোক্তারা সদস্য হতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। আগে যেখানে নতুন সদস্য ফি ছিল ২ হাজার টাকা এবং নবায়ন ফি ১ হাজার টাকা, সেখানে বর্তমান ফি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।
বক্তারা বলেন, অনেক উদ্যোক্তার মূলধনই এক লাখ টাকার মতো। তাদের জন্য ২০ হাজার টাকা দিয়ে সদস্য হওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তাই সংগঠনকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে সদস্যপদ ও নবায়ন ফি আগের মতো রাখার দাবি জানান তারা।
এ সময় নির্বাচন পরিচালনা বোর্ডের সভাপতি মোহাম্মদ জাকির হোসেন সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, সদস্যদের দাবি অনুযায়ী ফি কমানোর বিষয়ে আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নির্বাচন যাতে কোনোভাবেই বিতর্কিত না হয়, সে বিষয়েও নির্বাচন বোর্ড সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে।
প্রশাসক নারগিস মুরশিদাও সদস্যদের আশ্বস্ত করে বলেন, সংগঠনের সদস্যদের যৌক্তিক দাবি ও মতামত আইন অনুযায়ী বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মতবিনিময় সভায় গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন নাসিবের সাবেক সভাপতি মিজা নুরুল গনী শুভন, সাবেক আহ্বায়ক (কেন্দ্রীয় সংস্কার কমিটি) লায়ন মিজা মাসুদুর রহমান, সাবেক সহ-সভাপতি মুজিবুর রহমান বেলাল, ইফতেখার আলী বাবু, আরেফিন, মোহাম্মদ মনির উজ জামান, নারী কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রাহেলা পারভীন শিশির, চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি এ এস এম গাফফার মিয়াজী, নরসিংদী জেলা সভাপতি মোহাম্মদ রুস্তম আলী, চুয়াডাঙ্গা জেলা সভাপতি মোহাম্মদ অলি উল্লাহ, জামালপুর জেলা সভাপতি এনামুল হক খান মিলন, টাঙ্গাইল জেলা সভাপতি কে এম তৌহিদুল ইসলাম বাবু, জামালপুর জেলা পরিচালক শামীমা চৌধুরী চায়না, চট্টগ্রাম মহানগর ভাইস প্রেসিডেন্ট জাহাঙ্গীর আলমসহ বিভিন্ন জেলার নেতারা।
এছাড়া সভায় উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন পরিচালনা বোর্ডের সদস্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব প্রভাংশু সোম মহান, সিনিয়র সহকারী সচিব মো. মেহেদী হাসান, নির্বাচন আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান ও যুগ্মসচিব সাইফ উদ্দিন আহমেদ, বোর্ডের সদস্য তানিয়া ইসলাম এবং চৌধুরী সামিয়া ইয়াসমীন।
সভা শেষে অধিকাংশ সদস্যের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়, নাসিবের সদস্য নবায়ন ফি আগের মতো বহাল রাখা, জেলা থেকে তিনজন প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন, দ্রুত নির্বাচন সম্পন্ন করে নির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। সদস্যদের মতে, এসব দাবি বাস্তবায়িত হলে নাসিবে গণতান্ত্রিক পরিবেশ আরও সুদৃঢ় হবে এবং দেশের ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে।

















