ব্রেস্ট কনজারভিং সার্জারি: স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় স্তন সংরক্ষণের সুযোগ

36

স্তন ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর একজন নারীর মনে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। চিকিৎসা কীভাবে হবে, অস্ত্রোপচার করতে হবে কি না, স্তন সম্পূর্ণ অপসারণ করতে হবে কি না—এসব উদ্বেগের পাশাপাশি নিজের স্বাভাবিক জীবন ও আত্মবিশ্বাস ধরে রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে সব স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে পুরো স্তন অপসারণের প্রয়োজন হয় না। উপযুক্ত রোগীদের জন্য ব্রেস্ট কনজারভিং সার্জারি বা স্তন সংরক্ষণমূলক অস্ত্রোপচার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাপদ্ধতি।

Advertisement

ব্রেস্ট কনজারভিং সার্জারি কী?

ব্রেস্ট কনজারভিং সার্জারি হলো এমন একটি অস্ত্রোপচার, যেখানে ক্যানসার আক্রান্ত অংশ এবং তার চারপাশের প্রয়োজনীয় কিছু সুস্থ টিস্যু অপসারণ করা হয়, কিন্তু স্তনের বাকি অংশ সংরক্ষণ করা হয়। একে অনেক সময় লাম্পেকটমি বা ব্রেস্ট কনজারভিং সার্জারি বলা হয়। কোন পদ্ধতি উপযুক্ত হবে, তা নির্ভর করে টিউমারের আকার, অবস্থান, ক্যানসারের বিস্তার, স্তনের আকার এবং রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর।

এই অস্ত্রোপচারের লক্ষ্য শুধু ক্যানসার আক্রান্ত টিস্যু অপসারণ নয়; একই সঙ্গে যথাসম্ভব স্তনের স্বাভাবিক গঠন বজায় রাখাও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। তবে স্তন সংরক্ষণ করা যাবে কি না, তা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসাগত মূল্যায়ন জরুরি।

কারা এই অস্ত্রোপচারের জন্য উপযুক্ত?

প্রাথমিক পর্যায়ের অনেক স্তন ক্যানসারে ব্রেস্ট কনজারভিং সার্জারি বিবেচনা করা যায়। তবে শুধু ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে আছে কি না, সেটিই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। টিউমারের আকার ও অবস্থান, স্তনের তুলনায় টিউমারের অনুপাত, রোগের বিস্তার এবং অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ক্যানসার আক্রান্ত অংশ নিরাপদভাবে অপসারণ করা সম্ভব কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

কিছু ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের আগে ওষুধের মাধ্যমে টিউমারের আকার কমানোর চিকিৎসা দেওয়া হতে পারে। এতে পরবর্তী সময়ে স্তন সংরক্ষণমূলক অস্ত্রোপচারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি উপযুক্ত নয়। চিকিৎসকের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে ব্যক্তিভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

অস্ত্রোপচারের পর কি রেডিওথেরাপি প্রয়োজন?

ব্রেস্ট কনজারভিং সার্জারির পর অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রেই রেডিওথেরাপি চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর উদ্দেশ্য হলো স্তনে থেকে যেতে পারে এমন অতি ক্ষুদ্র ক্যানসার কোষ ধ্বংস করা এবং একই স্তনে ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকি কমানো। তবে রেডিওথেরাপির প্রয়োজন, সময়সূচি ও মেয়াদ রোগীর বয়স, ক্যানসারের বৈশিষ্ট্য, অস্ত্রোপচারের ফলাফল এবং অন্যান্য চিকিৎসাগত বিষয় বিবেচনা করে নির্ধারণ করা হয়।

কিছু রোগীর ক্ষেত্রে হরমোন থেরাপি, কেমোথেরাপি বা অন্যান্য ওষুধভিত্তিক চিকিৎসারও প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ, অস্ত্রোপচার চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা পরিকল্পনা কেবল অস্ত্রোপচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

স্তন সংরক্ষণ মানেই কি চিকিৎসায় কোনো ছাড়?

এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা জরুরি—স্তন সংরক্ষণমূলক অস্ত্রোপচার মানে ক্যানসারের চিকিৎসায় আপস করা নয়। উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে সঠিকভাবে নির্বাচিত অস্ত্রোপচার এবং প্রয়োজনীয় পরবর্তী চিকিৎসার সমন্বয়ে ভালো চিকিৎসা-ফল পাওয়া সম্ভব। অনেক উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে স্তন সংরক্ষণমূলক অস্ত্রোপচার ও রেডিওথেরাপির সমন্বয়ে পুরো স্তন অপসারণের সমতুল্য দীর্ঘমেয়াদি বেঁচে থাকার ফল পাওয়া যায়।

তবে সব রোগীর জন্য এই পদ্ধতি সমানভাবে উপযুক্ত নয়। ক্যানসার স্তনের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকলে, টিউমারের বিস্তার অনুযায়ী নিরাপদভাবে অপসারণ সম্ভব না হলে, অথবা রেডিওথেরাপি দেওয়া সম্ভব না হলে অন্য অস্ত্রোপচারপদ্ধতি বিবেচনা করতে হতে পারে। রোগীর নিরাপত্তা ও ক্যানসার নিয়ন্ত্রণই সিদ্ধান্তের প্রধান ভিত্তি।

সচেতন সিদ্ধান্তই চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ

স্তনে কোনো অস্বাভাবিক গাঁট, আকার বা আকৃতির পরিবর্তন, ত্বকে টান বা পরিবর্তন, নিপল ভেতরে ঢুকে যাওয়া কিংবা অস্বাভাবিক নিঃসরণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এসব লক্ষণ মানেই ক্যানসার নয়, তবে অবহেলা করাও ঠিক নয়। দ্রুত মূল্যায়ন হলে রোগ নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনার সুযোগ বাড়ে।

স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় প্রতিটি রোগীর প্রয়োজন আলাদা। তাই রোগের ধরন, অস্ত্রোপচারের বিকল্প, সম্ভাব্য সুবিধা ও ঝুঁকি এবং পরবর্তী চিকিৎসা সম্পর্কে চিকিৎসকের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা প্রয়োজন। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া রোগীকে চিকিৎসার পথ সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করে।

স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় লক্ষ্য শুধু রোগ নিয়ন্ত্রণ নয়; রোগীর জীবনমান, আত্মবিশ্বাস ও দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের। উপযুক্ত রোগীর জন্য ব্রেস্ট কনজারভিং সার্জারি সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হতে পারে।

লেখকঃ: ডা. মোঃ সুরমান আলী
এমবিবিএস, এফসিপিএস (সার্জারি)
সিনিয়র কনসালট্যান্ট অ্যান্ড কো-অর্ডিনেটর
ডিপার্টমেন্ট অব জেনারেল অ্যান্ড ল্যাপারোস্কপিক সার্জারি
এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম

Advertisement