স্তনে ব্যথা নেই, শরীরও স্বাভাবিক—তাহলে কি স্তন ক্যানসারের আশঙ্কা থাকতে পারে? অনেক নারীর মনেই এমন প্রশ্ন আসে। প্রচলিত একটি ধারণা হলো, স্তনে ব্যথা হলে তবেই চিকিৎসকের কাছে যাওয়া প্রয়োজন। বাস্তবে স্তন ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো ব্যথা থাকে না। এ কারণে শুধু ব্যথা হচ্ছে কি না, তার ওপর নির্ভর করে স্তনের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
স্তন ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতার প্রথম ধাপ হলো নিজের শরীরের স্বাভাবিক অবস্থা সম্পর্কে জানা এবং অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে তা অবহেলা না করা। অক্টোবর স্তন ক্যানসার সচেতনতা মাস আমাদের সেই দায়িত্বের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
কোন লক্ষণগুলো খেয়াল রাখা প্রয়োজন?
স্তনে নতুন কোনো চাকা বা পিণ্ড অনুভব করা স্তন ক্যানসারের পরিচিত লক্ষণগুলোর একটি। তবে সব চাকা ক্যানসার নয়। অনেক ক্ষেত্রে হরমোনের পরিবর্তন, সিস্ট বা অন্যান্য নিরীহ কারণেও এমন হতে পারে। পরীক্ষা ছাড়া শুধু হাত দিয়ে অনুভব করে কোনো পরিবর্তনের প্রকৃতি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
এ ছাড়া স্তনের আকার বা আকৃতিতে নতুন পরিবর্তন, ত্বকে গর্ত বা টান পড়া, ত্বক কমলার খোসার মতো হয়ে যাওয়া, নিপল নতুন করে ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া কিংবা নিপল থেকে অস্বাভাবিক স্রাব—বিশেষ করে রক্তমিশ্রিত স্রাব—দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বগলের নিচে নতুন চাকা বা ফোলাভাবও অবহেলা করা যাবে না।
এসব লক্ষণ দেখা দিলেই যে ক্যানসার হয়েছে, তা নয়। কিন্তু পরিবর্তনটি কেন হচ্ছে, তা নির্ণয় করা জরুরি। ব্যথা না থাকলেও অস্বাভাবিক পরিবর্তন থাকলে চিকিৎসা নিতে দেরি করা উচিত নয়।
ভয় ও সংকোচ কেন বাধা হয়ে দাঁড়ায়?
আমাদের সমাজে স্তনের স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এখনও অনেকের কাছে অস্বস্তিকর। কেউ লজ্জার কারণে লক্ষণ প্রকাশ করেন না, কেউ আবার ক্যানসারের আশঙ্কায় পরীক্ষা করাতে ভয় পান। অনেকে মনে করেন, বয়স কম হলে কিংবা পরিবারে কারও ক্যানসার না থাকলে তাঁদের ঝুঁকি নেই।
এসব ধারণা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণে দেরি ঘটাতে পারে। স্তন ক্যানসার বিভিন্ন বয়সের নারীর হতে পারে, যদিও বয়স বাড়ার সঙ্গে ঝুঁকি সাধারণত বাড়ে। পারিবারিক ইতিহাস না থাকলেও এই রোগ হতে পারে। তাই নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
কখন এবং কী ধরনের পরীক্ষা প্রয়োজন?
স্তনে নতুন বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। চিকিৎসক রোগীর বয়স, লক্ষণ, পারিবারিক ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষার ফল বিবেচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করেন। প্রয়োজন অনুযায়ী স্তনের আলট্রাসনোগ্রাফি, ম্যামোগ্রাফি বা বায়োপসির মতো পরীক্ষা করা হতে পারে।
মনে রাখা জরুরি, সব নারীর জন্য একই বয়সে বা একই ব্যবধানে একই পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। বয়স ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী স্তন ক্যানসার শনাক্তকরণের উপযুক্ত পদ্ধতি নির্ধারণ করা উচিত। কোনো লক্ষণ দেখা দিলে নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের সময় পর্যন্ত অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
রোগ নির্ণয় হলে কী করবেন?
পরীক্ষায় স্তন ক্যানসার ধরা পড়লে আতঙ্কিত না হয়ে রোগের ধরন ও পর্যায় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। চিকিৎসার পরিকল্পনা রোগীর অবস্থা অনুযায়ী তৈরি হয়। এতে অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, হরমোন চিকিৎসা, লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা অথবা রেডিওথেরাপি—একটি বা একাধিক পদ্ধতি প্রয়োজন হতে পারে।
এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামের ক্যানসার কেয়ার সেন্টারে রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ও চিকিৎসার পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। রোগী ও পরিবারের উচিত চিকিৎসকের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা, চিকিৎসার বিকল্পগুলো বোঝা এবং নির্ধারিত ফলোআপ বজায় রাখা।
সচেতনতাই হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ
স্তন ক্যানসার সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা, অস্বাভাবিক পরিবর্তন চিনতে পারা এবং প্রয়োজনের সময় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া—এই তিনটি অভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্তনে ব্যথা নেই বলে নিশ্চিন্ত থাকা যেমন ঠিক নয়, তেমনি কোনো পরিবর্তন দেখেই ক্যানসার ধরে নেওয়াও উচিত নয়।
এই অক্টোবরের অঙ্গীকার হোক—ভয় বা সংকোচ নয়, সচেতনতা ও সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। নিজের স্তনের স্বাভাবিক পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকুন, সন্দেহজনক লক্ষণ অবহেলা করবেন না এবং প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসা নিন। সময়মতো মূল্যায়ন ও উপযুক্ত চিকিৎসা স্তন ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
লেখক: ডা. হাসনিনা আক্তার
কনসালট্যান্ট, মেডিকেল অ্যান্ড রেডিয়েশন অনকোলজি
এভারকেয়ার হসপিটাল, চট্টগ্রাম।
















