আন্তর্জাতিক শেফ দিবস উপলক্ষে রন্ধনশিল্পী লুৎফুন নেসার বক্তব্য

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ শেফ তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মোঃ তৌহিদুল ইসলাম

29

চট্টলা নিউজ || চট্টগ্রাম, ২০ অক্টোবর ২০২৬: নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা, রন্ধনশিল্পে দক্ষ জনবল তৈরি এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের শেফদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন রন্ধনশিল্পী লুৎফুন নেসা। তাঁর মতে, আধুনিক রন্ধনশিল্পে শুধু সুস্বাদু খাবার তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; খাদ্যের গুণগত মান, স্বাস্থ্যবিধি, পুষ্টি, পরিবেশ সুরক্ষা এবং পেশাগত দক্ষতার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

Advertisement

আজ মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক শেফ দিবস উপলক্ষে চট্টলা নিউজের সঙ্গে আলোচনায় তিনি এসব বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন।

লুৎফুন নেসা বলেন, শেফদের দায়িত্ব কেবল খাবার রান্না ও পরিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। খাবার প্রস্তুতের প্রতিটি ধাপে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, নিরাপদ কাঁচামাল ব্যবহার, সঠিক তাপমাত্রায় খাবার সংরক্ষণ এবং খাদ্যদূষণ প্রতিরোধ করা একজন পেশাদার শেফের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে হোটেল-রেস্তোরাঁ, ক্যাটারিং, পর্যটন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের খাবার সরবরাহ ব্যবস্থায় শেফদের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এসব ক্ষেত্রে খাবারের স্বাদ ও পরিবেশনার পাশাপাশি খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন।

খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ

বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকারি তদারকির পাশাপাশি খাদ্য ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন এই রন্ধনশিল্পী।

তাঁর মতে, রেস্তোরাঁর মালিক থেকে শুরু করে শেফ, সহকারী বাবুর্চি, পরিবেশনকর্মী এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী সহ সবাইকে খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। নিরাপদ পানি ব্যবহার, হাত ধোয়া, রান্নাঘরের সরঞ্জাম পরিষ্কার রাখা, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা এবং খাবার যথাযথভাবে সংরক্ষণের নিয়মগুলো বাস্তবে অনুসরণ করা জরুরি।

তিনি মনে করেন, শুধু অভিযান বা জরিমানা করে খাদ্য নিরাপত্তার সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। এ জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কার্যকর তদারকি এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানে খাদ্য নিরাপত্তার গুরুত্ব

শিল্পকারখানা, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জাহাজ ও বড় ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের খাবার প্রস্তুত করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন লুৎফুন নেশা।

তিনি বলেন, খাবার প্রস্তুত ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সামান্য অসতর্কতাও অনেক মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্যান্টিন ও বড় রান্নাঘরগুলোতে প্রশিক্ষিত শেফ, মান নিয়ন্ত্রণকর্মী এবং খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী থাকা প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, পুষ্টিমান বজায় রাখা, কাঁচামালের মান যাচাই, রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা এবং খাবারের অপচয় কমানোর বিষয়ে কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।

আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের শেফদের সম্ভাবনা

আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের শেফদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন এই রন্ধনশিল্পী। মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হোটেল, রেস্তোরাঁ, জাহাজ ও ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পেতে হলে প্রশিক্ষণার্থীদের আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

তাঁর মতে, শুধু রান্নার কাজে পারদর্শী হলেই আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা যায় না। খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি, কিচেন ম্যানেজমেন্ট, পেশাগত ভাষা- ইংরেজি,আরবি ইটালি, জার্মানি ইত্যাদি এবং আধুনিক রান্নার কৌশল সম্পর্কেও জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।

এ জন্য কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে বাস্তব কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। প্রশিক্ষণার্থীদের হোটেল-রেস্তোরাঁয় শিক্ষানবিশি, ব্যবহারিক দক্ষতা যাচাই এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রশিক্ষণ ও সনদ অর্জনের সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

একই সঙ্গে বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বৈধ নিয়োগপ্রক্রিয়া অনুসরণ, চাকরির চুক্তি যাচাই এবং কর্মীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

পরিবেশবান্ধব রন্ধনশিল্প গড়ে তোলার আহ্বান

আধুনিক রন্ধনশিল্পে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন লুৎফুন নেশা। তাঁর মতে, খাবারের অপচয় কমানো, পানি ও জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার, স্থানীয় ও মৌসুমি উপকরণ কাজে লাগানো এবং রান্নাঘরের বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রন্ধনশিল্পকে আরও টেকসই করা সম্ভব।

তিনি মনে করেন, নতুন প্রজন্মের শেফদের প্রশিক্ষণের সময় থেকেই খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি, পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশগত দায়িত্ব সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। এতে একদিকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে, অন্যদিকে রেস্তোরাঁ ও খাদ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব

আন্তর্জাতিক শেফ দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে লুৎফুন নেশা বলেন, রন্ধনশিল্পকে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সরকারি সংস্থা, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন এবং বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

তাঁর মতে, দক্ষতা উন্নয়ন, নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা, কর্মক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী জনবল তৈরির উদ্যোগ বাড়ানো গেলে বাংলাদেশি শেফদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের পথ তৈরি হতে পারে।

আন্তর্জাতিক শেফ দিবসে তাঁর প্রত্যাশা, বাংলাদেশের রন্ধনশিল্প আরও পেশাদার, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব হয়ে উঠবে এবং এ খাতের দক্ষ কর্মীরা দেশে-বিদেশে তাঁদের যোগ্যতার স্বীকৃতি পাবেন।

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং দক্ষ শেফ তৈরি—দুটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। রন্ধনশিল্পে প্রশিক্ষণ ও পেশাগত মানোন্নয়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষতা তৈরিতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে এ খাত বাংলাদেশের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পরিচিতি: রন্ধনশিল্পী জনাব লুৎফন নেসা একজন পেশাদার শেফ। তিনি সার্টিফাইড ট্রেইনার এন্ড এসেসর। বর্তমানে একটি বেসরকারি দক্ষতা উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানে মাল্টিকুইজিন শেফ কোর্সের লিড টেইনার হিসেবে কাজ করছেন।

Advertisement