শেখ হাসিনার রক্তের স্বাদ এখনো মেটেনি, দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র চলছে: রিজভী

27

শেখ হাসিনা ১৭ বছর ধরে ক্ষমতায় থেকে অসংখ্য মানুষের রক্ত ঝরিয়েছেন। নেতা-কর্মীদের গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার করেছেন। এত রক্ত ঝরানোর পরও তাঁর রক্তের স্বাদ মেটেনি। দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েও পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে নানা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্টের চেষ্টা করছেন। শ্রমিকদের আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে। তবে বাংলাদেশের জনগণ কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হতে দেবে না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও জাতীয় ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ।

Advertisement

তিনি বলেন, ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের মূল চেতনা হলো মানুষের গলা ছেড়ে কথা বলার অধিকার এবং যেকোনো রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করার স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা। গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়ে কোনো শক্তিই এ দেশের জনগণকে দীর্ঘদিন দমিয়ে রাখতে পারবে না।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেল ৩টায় নগরের জমিয়াতুল ফালাহ সড়কসংলগ্ন আলমাসের সামনে আয়োজিত এ সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রিজভী এসব কথা বলেন।

সমাবেশ শেষে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির উদ্যোগে একটি বর্ণাঢ্য র‍্যালি বের করা হয়। র‍্যালিটি নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে শেষ হয়।আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দৃঢ় অঙ্গীকার এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রত্যয় নিয়ে ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রামে বিশাল সমাবেশ ও বর্ণাঢ্য র‍্যালির আয়োজন করে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি। দিবসটি সামনে রেখে আয়োজিত এ সমাবেশে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় ঐক্যের চেতনা তুলে ধরেন দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে রিজভী বলেন, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ১৭ বছর মানুষের কথা বলার অধিকার কেড়ে নিয়েছে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করেছে এবং দেশের মানুষকে জিম্মি করে রেখেছিল। গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিল তারা। নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্ব ও পাল্টাপাল্টি লড়াইয়ের মাধ্যমে দেশের জনজীবনে দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছিল। এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ ও দেশপ্রেমিক সৈনিকদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান থেকে গণতন্ত্রের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল।

তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সেদিন সৈনিক ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রত্যয় নতুন করে জাগ্রত হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়েছিল। ৭ নভেম্বর তাই কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, এটি মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক।

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, ওই সময়ে দেশে গণতন্ত্র সংকুচিত করে বাকশাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছিল এবং দেশে লুটপাট ও দুর্নীতির পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার সংঘাতও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পরবর্তী সময়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, কৃষি ও শিল্পের বিকাশ এবং স্বনির্ভর বাংলাদেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেও তিনি কাজ করেন।

রিজভী আরও বলেন, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন প্রমাণ করেছে, এ দেশের মানুষ গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার প্রশ্নে কখনো আপস করে না। ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার শাসনামলে বিএনপির অসংখ্য নেতা-কর্মীকে বাড়িতে থাকতে দেওয়া হয়নি। রাতের আঁধারে তাঁদের তুলে নেওয়া হয়েছে, মিথ্যা মামলায় আটক করা হয়েছে এবং গুম-নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকেও দীর্ঘদিন বন্দী করে রাখা হয়েছিল। গুম, খুন, আয়নাঘর, বিচারবহির্ভূত হত্যা, দুর্নীতি ও দুঃশাসনের মধ্য দিয়ে মানুষের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে এবং গণতন্ত্রের নতুন পথ উন্মুক্ত হয়। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই সংগ্রামকে কোনোভাবেই ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না।

বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বের প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেগুলো বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে কাজ করছেন। তিনি মিথ্যা আশ্বাস দেন না; দেশের উন্নয়ন ও মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে তাঁর পরিকল্পনা রয়েছে।

দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে রিজভী অভিযোগ করেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনজীবনে অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা চলছে। শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে অরাজকতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরাও রয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
রিজভী বলেন, দেশের জনগণ এখন অনেক বেশি সচেতন। কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হতে দেওয়া হবে না। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে সব ধরনের অপচেষ্টা প্রতিহত করবে।

Advertisement