অবিলম্বে চা শ্রমিকদের ৩০০ টাকা মজুরির দাবি মেনে নিয়ে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে পদক্ষেপ নিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আবেদন জানানো হয়েছে চট্টগ্রামের এক সমাবেশ থেকে।
সোমবার বিকালে চট্টগ্রাম শহরের চেরাগী পাহাড় মোড়ে চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনের সমর্থনে ‘সচেতন নাগরিকবৃন্দ, চট্টগ্রাম’ আয়োজিত সংহতি সমাবেশ থেকে এ দাবি জানানো হয়।
সমাবেশে বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, “চা শ্রমিকদের বেতন মাত্র ১২০ টাকা। অথচ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করার লোক এ দেশে আছে। এর স্থায়ী সমাধান করতে হলে রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিবর্তন করতে হবে।
“মুক্তিযুদ্ধে চা শ্রমিকদের অনেক ত্যাগ। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় কেন্দ্র ছিল চা শ্রমিকদের বাড়ি। অথচ তাদের জীবনমান আজো মানবেতর। আশা রাখি, প্রধানমন্ত্রী এর সমাধান দেবেন। সমাধান না হলে আবার আমরা পথে নামব।”
সমাবেশে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান বলেন, “শ্রমিকদের রক্তের ওপর হাজার কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন মালিকরা। অথচ তারা ৩০০ টাকা মজুরি দিতে পারছেন না। শ্রমিকদের ওপর এ অত্যাচার বন্ধ করতে হবে। তাদের দাবি মেনে নিন।
“শ্রম মন্ত্রণালয়কে বলব, অবিলম্বে গার্মেন্টস শ্রমিকদের মত সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ করা হোক এবং তা যেন কমপক্ষে গার্মেন্টস শ্রমিকদের সমান হয়। আজ শ্রমিক সমাজের কোনো স্বপ্ন নেই। সন্তানদের ভবিষ্যত গড়তে পারে না। চা শ্রমিকদের বছরের পর বছর যে শোষণ করা হয়েছে এর জবাব একদিন দিতে হবে।”
সমাবেশে নাট্যজন প্রদীপ দেওয়ানজী বলেন, “চা বাগানের মালিকদের একটা কুকুরের জন্য যা খরচ হয় ১০ জন শ্রমিকের এক মাসের বেতন তার চেয়ে কম। চা বাগান মালিকরা শুধু ধনী না অতি ধনী। বাংলাদেশে যারা চা শ্রমিকদের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন না তারা মানবিক মানুষ নন।
“এ আঘাত শুধু চা শ্রমিকদের ওপর নয় সব পেশার মানুষের ওপর আসবে। বাংলাদেশকে কিছু পরিবার অজগর সাপের মত পেঁচিয়ে ফেলেছে। চা শ্রমিকদের বেতন যদি ৩০০ টাকাও করা হয় তাও কি যৌক্তিক? ৯ হাজার টাকায় আজকের দিনে কেউ একটা সংসার চালাতে পারবে? শ্রমজীবী মানুষ যখন বুঝবে তাদের আর বাঁচার উপায় নেই সেদিন তারা ঘুরে দাঁড়াবেই।”
তিনি বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ১৪৫ টাকা বেতন নির্ধারণ আপনার অগোচরে যদি হয়ে থাকে, তাহলে আপনি সেটা দেখুন। একটা মানুষ হিসেবে বাঁচতে যে মজুরি প্রয়োজন হয় সেটা আপনি নিশ্চিত করুন।”
ওয়ার্কার্স পার্টির চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক শরীফ চৌহান বলেন, “দ্রব্যমূল্যের চরম ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মধ্যবিত্তই চলতে পারে না, চা শ্রমিকরা কীভাবে চলবে? সরকারের অনেক সামাজিক কর্মসূচি আছে। সেগুলোতে চা শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করলে অন্তত তারা কিছু সুযোগ পেত জীবন ধারণের জন্য।
“তাদের সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থা নেই। তাদের চিকিৎসা কিভাবে চলে? তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি সমর্থন জানাই। এ আন্দোলন যদি দীর্ঘতর হয়, আমরা তাদের সাথে থাকব। সরকারের উচিত এ যৌক্তিক দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে চা শ্রমিকদের দাবি অবিলম্বে মেনে নেওয়া।”
প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, “নিরীহ বঞ্চিত চা শ্রমিকরা জীবনের প্রয়োজনে পথে নেমেছেন। তাদের যে ঘর দেয়া হয় তা মানুষের বাসযোগ্য নয়। বাগানে স্কুল থাকা বাধ্যতামূলক হলেও অনেক বাগানে তা নেই।
“শ্রমিকরা কেউ মানেনি ১৪৫ টাকা। তাদের কেউ কেউ হয়ত পেটের জ্বালায় বাগানে ফিরেছেন। কত কেজি পাতা তুললে ১২০ টাকা বেতন দেয়। এটা কেউ বলছেন না। আপনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা, আপনি সংবেদনশীল হোন। চা বাগান মালিকদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য করুন।”
সমাবশে বিএফইউজের যুগ্ম মহাসচিব মহসীন কাজী বলেন, “চা বাগানের উচ্চপদস্থদের যে বেতন ও সুযোগ সুবিধা তা আকাশচুম্বী। ১৬৫ বছর ধরে চা শিল্প আছে। অথচ শ্রমিকরা ১৬৫ টাকা দৈনিক বেতনও পায় না।
“আজ দিনমজুররা মজুরি নেন এখন ৭০০ টাকা। আর ৩০০ টাকা দিতে মালিকরা নাকি ফতুর হয়ে যাবে। চা শ্রমিকদের দাবি মানা না হলে আমরা রাজপথে নামব।”
সাংবাদিক প্রীতম দাশের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জাসদ নেতা জসিম উদ্দিন বাবুল, ন্যাপ এর কেন্দ্রীয় নেতা মিটুল দাশগুপ্ত, আবৃত্তি শিল্পী রাশেদ হাসান, শ্রমিক নেতা ফজলুল কবির মিন্টু, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ঋতিক নয়ন, আবৃত্তি শিল্পী প্রণব চৌধুরী, সাংবাদিক অনুপম শীল, সোলাইমান আকাশ, বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদার স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সিঞ্চন ভৌমিক, যুব ইউনিয়ন সাংগঠনিক সম্পাদক রাশেদুল সামির, আইনজীবী আবিদুর রহমান প্রমুখ।
















