রনজিত কুমার শীলঃ বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতসহ মহানগরী ও জেলার অন্যান্য স্থানে অত্যন্ত সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হয়েছে।
আজ বুধবার (৫ অক্টোবর) দুপুর থেকে সেখানে প্রতিমা বিসর্জন শুরু হয়। প্রতিমা বিসর্জনকালে কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। নানা ধর্মের, শ্রেণি ও পেশার মানুষের অংশগ্রহণে প্রতিমা বিসর্জন স্থল হাজারো মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয়। বিসর্জন উপলক্ষে পতেঙ্গা সৈকতে সকাল থেকে ভিড় জমাতে শুরু করে দর্শনার্থীরা। দুপুর গড়াতেই লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে পতেঙ্গা সৈকত। বেলা বাড়তেই পতেঙ্গা সৈকতে বাড়তে থাকে সারি সারি ট্রাকের লাইন। এসময় দায়িত্বরত স্বেচ্ছাসেবকরাও ছিল বেশ তৎপর।
প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে আজ পতেঙ্গা সৈকতে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদ। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন সিটি মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা এম. রেজাউল করিম চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মহানগর পূজা পরিষদের সভাপতি লায়ন আশীষ কুমার ভট্টাচার্য।
প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে পর্দা নামল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ৫ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসবের। গত ১ অক্টোবর (শনিবার) ষষ্ঠী পূজার মধ্যদিয়ে শুরু হয়েছিল হিন্দুদের সবচেয়ে বড় এই ধর্মীয় উৎসব। তল-সিঁদুর পরিয়ে, পান, মিষ্টি মুখে দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাতে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে ভিড় করেন ভক্ত ও অনুরাগীরা। ধর্মীয় রীতি মেনে নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত ছাড়াও ফিরিঙ্গিবাজার নেভাল-২, অভয়মিত্র ঘাট, কাট্টলী ও কর্ণফুলী নদীর কালুরঘাট সেতু এলাকায়সহ ১০টি স্থানে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়।
হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী, এ বছর দেবী দুর্গা মর্ত্যে এসেছেন গজে চড়ে। শাস্ত্রমতে গজ দেবীর উৎকৃষ্টতম বাহন। তাই দেবীর আগমন হাতিতে হলে মর্ত্যলোক ভরে ওঠে সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধিতে। পূর্ণ হয় ভক্তদের মনোবাঞ্ছা। পরিশ্রমের সুফল পায় মর্তলোকের অধিবাসীগণ। অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টি নয়, ঠিক যতটা প্রয়োজন ততটা বর্ষণ হয়। গতকাল বুধবার বিজয়া দশমীতে মা দুর্গা পুত্র-কন্যাসহ কৈলাশে ফিরে গেলেন নৌকায় চেপে। এর ফলে জগতের কল্যাণ সাধিত হবে। সকাল থেকে চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন পূজা মন্ডপ থেকে প্রতিমা বিসর্জনের জন্য ট্রাকবাহী প্রতিমা নিয়ে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে ভক্তরা জড়ো হতে শুরু করেন পতেঙ্গা সৈকতে। এরপর শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জনের পালা।
এর আগে সকালে দশ উপাচারে দেবীর বিহিত পূজা ও দর্পণ বিসর্জন সম্পন্ন হয়। এর মধ্য দিয়েই শেষ হয় শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। পরে দেবীর চরণে ফুল, সিঁদুর, বেলপাতা ও মিষ্টি দিয়ে বিভিন্ন আচার পালন করে ভক্তরা। লাল রঙকে শক্তির প্রতীক হিসেবে মনে করে নারীরা একে অপরের মাথায় সিঁদুর ছোঁয়ান। দীর্ঘায়ু কামনা করেন পরিবারের সদস্যদের।
এদিকে প্রতিমা বিসর্জন নির্বিঘ্ন করতে বিভিন্ন প্রস্তুতি প্রহণ করেন প্রশাসন। পতেঙ্গা থানার ওসি মোঃ মাহফুজুর রহমান জানান, শান্তিপূর্ণভাবে সাগরে প্রতিমা বিসর্জনের জন্য সব প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা নির্বিঘেœ প্রতিমা বিসর্জন দিতে সৈকত ও আশপাশ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি লায়ন আশীষ কুমার ভট্টাচার্য্য বলেন, এবছর চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রধান পূজামন্ডপ জেএম সেন হলসহ ১৬টি থানায় ব্যক্তিগত, ঘটপূজাসহ ২৮২টি পূজামন্ডপে পূজা উদযাপন হয়। পরিষদের পক্ষ থেকে সবাইকে বুধবার সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। ধর্মীয় রীতি মেনে নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত, ফিরিঙ্গিবাজার নেভাল-২, অভয়মিত্র ঘাট এবং কালুরঘাট সেতু এলাকায় কর্ণফুলী নদীতে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। প্রতিমা বিসর্জনকালে কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
তিনি আরও বলেন, গত কয়েক বছর করোনার কারণে পূজার্থীরা প্রতিমা বিসর্জনে স্বতঃস্ফূর্ত অংশ গ্রহণ করতে পারেনি। এ বছর কোনো বিধি নিষেধ না থাকায় সকলে নির্বিঘ্নে বিসর্জন দিতে পেরেছে।
এদিকে প্রতিমা বিসর্জন সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সহযোগিতায় সিটি করপোরেশন পতেঙ্গা সৈকতে অস্থায়ী প্যান্ডেল তৈরি, আলোকসজ্জা, প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা ও পানীয় জলের ব্যবস্থা করে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ছিল ব্যাপক উপস্থিতি। প্রায় ৩’শ পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি র্যাব, কোস্টগার্ড, ডিবি, ট্যুরিস্ট পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। অন্যদিকে আজ বুধবার)বিজয়া দশমীতে পূজামন্ডপগুলোতে আনন্দের পাশাপাশি ছিল বিদায়ের বিষন্নতা। সকালে দশমীর পূজা শেষে পুষ্পাঞ্জলি ও শান্তির জল গ্রহণের মাধ্যমে শেষ হয় দর্পণ বিসর্জন।
এরপর বিবাহিত নারীরা পরিবারের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গার কপাল-চরণে তেল-সিঁদুর ও মুখে পান-মিষ্টি দেন। এছাড়া শিক্ষার্থীরা ১০৮ বার লেখা ‘শ্রী শ্রীমা দুর্গা’ চিরকুট দেবীর হাতে গুজে দেয়। পরে সিঁদুর খেলায় মেতে উঠে ছোট-বড় সবাই। এসব আনন্দের স্মৃতি মুঠোফোনে তুলে নিতে ভুল করেনি অনেকেই। আবার কেউ কেউ সেসব ছবি পোস্ট করেছে নিজের ফেসবুকে।

















