নিষিদ্ধ জালে হুমকিতে মৎস্যসম্পদ, ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জেলেরা

132

জিয়াবুল হক, সাতকানিয়া প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার সাঙ্গু নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে দীর্ঘদিন ধরে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে নির্বিচারে মাছ শিকার করা হচ্ছে। এতে ধ্বংস হচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছের পোনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রকৃত জেলেরা। এ ছাড়াও হুমকির মুখে পড়েছে প্রকৃত জেলেদের জীবিকা ও নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য।

Advertisement

প্রকৃত জেলেরা জানিয়েছেন, কিছু অসাধু জেলে ও সৌখিন মৎস্য শিকারীরা প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে মাছ শিকার করলেও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিচ্ছে না মৎস্য অফিস। তবে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার দাবি, ইতোপূর্বে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারকারীদের অর্থদণ্ডের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ জাল ধ্বংস করা হয়েছে।

জানা যায়, নদীতে মাছ শিকারের ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল তথা কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারি জাল, মশারি জাল, বেড় জাল ও বেহুন্দি জাল ব্যবহার পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এসব জাল ব্যবহারে মাছের প্রাকৃতিক বংশবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে কয়েক বছরের মধ্যে নদীর মৎস্যসম্পদ মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। এ ছাড়াও এসব নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের ফলে ছোট মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণি ধ্বংস হওয়ায় পুরো খাদ্যচক্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

উপজেলার পুরানগড় ইউনিয়নের শীলঘাটা গ্রাম ঘেঁষে সাঙ্গু নদী প্রবাহিত হয়েছে। সরেজমিনে শীলঘাটা-ধোপাছড়ি ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, একদল জেলে নিষিদ্ধ বেড় জাল ব্যবহার করে নদীতে মাছ শিকার করছেন। তাদের ব্যবহৃত জালের ফাঁস এতটাই ছোট যে সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির ছোট-বড় মাছ থেকে শুরু করে অন্যান্য জলজ প্রাণি এবং ছোট ছোট পোনাও আটকা পড়ছে। ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

তাদের মধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলে বলেন, এখন নদীতে বড় মাছ নেই বললেই চলে। তাই বড় ফাঁসের জাল ব্যবহার করেও মাছ না পেয়ে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। সেজন্য আমরা এক প্রকার বাধ্য হয়ে বেড় জাল ব্যবহার করে মাছ শিকার করছি। দৈনিক ৮ থেকে ১০ বার জাল ফেলে যে পরিমাণ মাছ আসছে সেগুলো বিক্রি করে আমাদের সংসার চলে।

ডিঙি নৌকায় চড়ে সাঙ্গু নদী থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন লালমোহন জলদাস। তিনি বলেন, আমরা বৈধ জাল ব্যবহার করে মাছ ধরি। কিন্তু কিছু অসাধু জেলে ও সৌখিন মৎস্য শিকারীরা প্রতিনিয়ত কারেন্ট জাল ও বেড় জাল ব্যবহার করে মাছ ধরছেন। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নদীতে থেকেও মাছের দেখা মিলছে না। এজন্য সংসার চালাতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

সঞ্জীবন জলদাস ও টুনু জলদাস বলেন, আমাদের মধ্যে কিছু জেলে আছেন যারা দিনের বেলায় বৈধ জাল দিয়ে মাছ ধরলেও রাতের আঁধারে কারেন্ট জাল ও বেড় জাল ব্যবহার করেন। তারা জীবিকার তাগিদে এমনটা করতে বাধ্য হচ্ছেন। আগে নদীতে জাল ফেললেই বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু এখন নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় একসময়ের মাছসমৃদ্ধ এই নদী এখন প্রাণহীন জলধারায় পরিণত হতে চলছে।

স্থানীয় মৎস্য চাষি নাছির উদ্দিন বলেন, সাঙ্গু শুধু একটি নদী নয়, এটি এখানকার মানুষের জীবিকা, সংস্কৃতি ও পরিবেশের অংশ। নদীতে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার দ্রুত সময়ের মধ্যে বন্ধ করা না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। মৎস্যসম্পদ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত টহল ও নজরদারি বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রশাসন, জেলে ও সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

কানিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফাহাদ হাসান বলেন, ইতোপূর্বে উপজেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে একাধিক জেলেকে অর্থদণ্ডের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ জাল ধ্বংস করা হয়েছে। আমরা জেলেদের শত্রু নই বরং তাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছি। সাময়িক লাভের আশায় নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করলে শেষ পর্যন্ত জেলেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই সবাইকে আইন মেনে বৈধ জাল ব্যবহার করে মাছ শিকারে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।

Advertisement