অভিবাসন মানচিত্রে নতুন ধারা, দাপট কমেছে চট্টগ্রামের

32

➤চট্টগ্রামের কর্মীরা যেতে চান পছন্দের দেশে, নির্দিষ্ট পেশায়
➤জেলায় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদেশে যেতে অনীহা
➤মধ্যপ্রাচ্যের স্বল্প বেতন তাদের কাছে নয় আকর্ষণীয়
➤২০২৫ সালে চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন দেশে গেছেন ৪১ হাজার ৯০০ কর্মী

Advertisement

বিদেশের শ্রমবাজারে দাপুটে অবস্থান হারিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। দশকের পর দশক শীর্ষস্থান ধরে রাখা চট্টগ্রামের আগে অবস্থান করে নিয়েছে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর জেলা। আর চট্টগ্রামের এ পতনের মধ্য দিয়ে দেশের অভিবাসন মানচিত্রে লক্ষ্য করা যাচ্ছে পরিবর্তনের নতুন ধারা।

২০০৫ সালের আগপর্যন্ত দীর্ঘদিন শীর্ষস্থান ছিল চট্টগ্রামের দখলে। এরপর কুমিল্লার সঙ্গে চট্টগ্রামের শুরু হয় এক ধরনের লড়াই।

২০০৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১৪ বছর চট্টগ্রাম জেলা শীর্ষ তালিকার দ্বিতীয় স্থানটি প্রায় স্থায়ীভাবে ধরে রেখেছিল। এ সময়ে এই জেলা থেকে গড়ে প্রতিবছর ৪০-৫০ হাজার মানুষ কর্মসংস্থানের উদ্দেশে পাড়ি জমাত। এমন তথ্যই জোগাচ্ছে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)। ২০১৭ সালে ৮৩ হাজার ৫০০ কর্মী পাঠানো হয়, যা জেলার ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

আলোর সঙ্গে যেমন আঁধারের, সাফল্যের সঙ্গে তেমনি ব্যর্থতার— ২০১৯ সালে শুরু হয় চট্টগ্রামের জনশক্তি রপ্তানিতে পতন। দীর্ঘদিনের দ্বিতীয় অবস্থান হারিয়ে তৃতীয় স্থানে নেমে যায় সেবার। দ্বিতীয় স্থানটি চলে যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার দখলে। এর পরের গল্প কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এগিয়ে যাওয়ার।

কোভিড মহামারী শুরু হলে আরও পিছিয়ে পড়ে চট্টগ্রাম। এ সময় চাঁদপুর এসে দখল করে তৃতীয় অবস্থান, চট্টগ্রাম চলে যায় চতুর্থ স্থানে। পরে অবশ্য ২০২৩ সালে একবার দ্বিতীয় স্থানে উঠেছিল। কিন্তু এর পর থেকে চতুর্থ স্থানটিই যেন পাকা হয়ে গেছে চট্টগ্রামের সঙ্গে।

কেন জনশক্তি রপ্তানিতে চট্টগ্রামের এই দশা— তা জানতে কথা হয় জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর উপপরিচালক (প্রশাসন) জহিরুল আলম মজুমদারের সঙ্গে। অনেক বছর তিনি চট্টগ্রামের জনশক্তি, কর্মসংস্থান অফিসপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার মতে, চট্টগ্রাম জেলার বিদেশগামী কর্মীদের সঙ্গে অন্য জেলার কর্মীদের চাকরির ধরনে পার্থক্য আছে। চট্টগ্রামের কর্মীরা প্রধানত যান মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও সৌদি আরব। তাদের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে ব্যবসা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাজ করা; অন্য পেশায় তাদের আগ্রহ খুব কম।

নানা কারণে কয়েক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে চট্টগ্রামের কর্মীদের প্রধান গন্তব্য— দেশগুলোর শ্রমবাজার। পছন্দের দেশে যেতে না পারায় স্বাভাবিকভাবেই ভাটা পড়েছে এ জেলার কর্মীদের বিদেশ যাওয়ার ঝোঁক। আবার আগের চেয়ে চট্টগ্রামে বেড়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। বিদেশে গিয়ে তারা যে বেতনে চাকরি করবেন, তার চেয়ে ভালো বেতন পাচ্ছেন বাড়ির কাছেই। এটিও বিদেশবিমুখিতার আরেকটি কারণ।

জহিরুল আলম মজুমদার বলেছেন, ‘কুমিল্লা একটি বড় জেলা। যেখানকার কর্মীদের নির্দিষ্ট কোনো কাজ বা পছন্দের গন্তব্য নেই। তারা সুযোগ পেলে যাচ্ছেন যেকোনো দেশেই। ফলে ছোট ছোট দেশে যাওয়ায় মোটাদাগে তারা এগিয়ে আছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুরও কুমিল্লার পথ অনুসরণ করছে। ফলে শ্রমবাজারের বড় গন্তব্য দেশগুলো বন্ধ থাকলেও আফ্রিকা-ইউরোপের ছোট দেশে চাকরি করতে গিয়ে এই তিন জেলার মানুষ এগিয়ে যাচ্ছেন।’

চট্টগ্রামের কর্মীদের নিয়ে প্রায় একই ধরনের পর্যবেক্ষণ গালফ ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলমের, ‘মিরসরাইয়ে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, কর্ণফুলী টানেলসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ঘিরে চট্টগ্রামে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি সৃষ্টি হয়েছে। ফলে তারা বিদেশে অদক্ষ শ্রমবাজারে পাড়ি দেওয়ার আগ্রহ হারিয়েছে।’

‘তা ছাড়া উচ্চ জীবনযাত্রার মান ও মাথাপিছু আয়ের কারণে একজন চট্টগ্রামবাসীর কাছে মধ্যপ্রাচ্যের স্বল্প বেতন এখন অর্থনৈতিকভাবে অলাভজনক ও সামাজিকভাবে কম আকর্ষণীয়। এতে চট্টগ্রাম পিছিয়েছে, অন্য জেলাগুলো এগিয়ে গেছে’— যোগ করেন তিনি।

বিএমইটি এবং বেসরকারি সংস্থা রামরুর একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের মানুষের কাছে বিদেশে কাজ করতে যাওয়া এক ধরনের সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এসব এলাকার একজন ব্যক্তি বিদেশে গিয়ে কাজ করে গ্রামে বড় পাকা বাড়ি তৈরি করেন। তা দেখে আশপাশের অন্যদের মধ্যেও বিদেশ যাওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়।

আবার এ জেলাগুলোর প্রবাসীরা বিদেশের মাটিতে অত্যন্ত সুসংগঠিত। তারা একে অন্যকে ভিসা জোগাড় করে দেওয়া, কাজ খুঁজে দেওয়া এবং থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে দারুণ সহযোগিতা করেন। এ সামাজিক নিরাপত্তাবলয়ই এ অঞ্চলের মানুষের বিদেশ যাওয়ার ভয় কমিয়েছে এবং অভিবাসন হার ঊর্ধ্বমুখী করে রেখেছে— বলছে গবেষণা।

উল্টো দিকে চট্টগ্রামের অর্থনীতি এগোচ্ছে অন্যভাবে। জেলার রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোও এখন আবাসন বা জাহাজভাঙার মতো অন্য লাভজনক ব্যবসায় বিনিয়োগ সরিয়ে নিয়েছে।

কুমিল্লার প্রতিটি গ্রামে যেখানে রিক্রুটিং এজেন্সির সাব-এজেন্টরা গিয়ে মানুষকে বিদেশ যাওয়ায় উদ্বুদ্ধ করছেন, সেখানে চট্টগ্রামের মানুষ এখন আর এ বুদ্ধি নিচ্ছেন না। কারণ, তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাবলম্বী।

এই প্রাতিষ্ঠানিক ও নেটওয়ার্কিং দুর্বলতাও চট্টগ্রাম থেকে জনশক্তি রপ্তানি কমিয়েছে বলে উঠে এসেছে বিএমইটির পর্যবেক্ষণে। বিএমইটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কুমিল্লা থেকে সাড়ে ৭৬ হাজার কর্মীর বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছে। একই সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ৬৭ হাজার, চাঁদপুর থেকে প্রায় ৪৩ হাজার আর চট্টগ্রাম থেকে কর্মী গেছেন বিদেশে ৪১ হাজার ৯০০ জন।

চলতি বছর জানুয়ারি থেকে ২৪ এপ্রিল (শুক্রবার) পর্যন্ত কুমিল্লা থেকে বিদেশে গেছেন ২০ হাজার ৫২০ জন কর্মী। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ১৩ হাজার ৫০০, চট্টগ্রাম থেকে ৯ হাজার, নোয়াখালী থেকে ৮ হাজার ২০০ এবং চাঁদপুর থেকে গেছেন ৮ হাজার ১০০ জন।

Advertisement