১ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে মাতারবাড়ীতে হচ্ছে পরিবেশবান্ধব ডকইয়ার্ড

27

মাতারবাড়ীতে ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে পরিবেশবান্ধব ‘এ গ্রীন ডকইয়ার্ড অ্যান্ড শিপবিল্ডিং ফ্যাসিলিটি’ নির্মাণের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।

Advertisement

এটি হবে গভীর সমুদ্রবন্দরের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক জাহাজ মেরামত কেন্দ্র, হাজার হাজার দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্লু-ইকোনমি সচল করতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

সম্পূর্ণ ল্যান্ডলর্ড মডেলের অধীনে সরকারি জমির মালিকানা সুরক্ষিত রেখে বেসরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে এই মেগা-প্রকল্প।

সোমবার (১৩ জুলাই) চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের চ্যানেল ও অপারেশনাল সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং দেশের সামুদ্রিক অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের সূচনার লক্ষ্যে বহুল প্রতীক্ষিত ‘মাতারবাড়ী গ্রীন ড্রাইডক অ্যান্ড শিপবিল্ডিং ফ্যাসিলিটি’ প্রকল্পের Unsolicited Proposal নীতিগত অনুমোদন পরবর্তী দ্রুত প্রক্রিয়াকরণের জন্য পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। এই যুগান্তকারী প্রকল্প গ্রহণের বাস্তবমুখী সিদ্ধান্তের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং এতে প্রশাসনিক নীতিগত সমর্থন দেওয়ার জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় প্রশংসার দাবিদার।

রুলস অব বিজনেস ১৯৯৬ অনুযায়ী ডকইয়ার্ড শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত হলেও, প্রকল্পের কৌশলগত গুরুত্ব এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বিবেচনা করে গত ৭ জুন অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় শিল্প মন্ত্রণালয় এ প্রকল্পে তাদের ‘অনাপত্তি’ দিয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে প্রকল্পটির বাস্তবায়নের পথ সুগম হলো।

অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এআইএস মেরিন ইনভেস্টমেন্টস পিটিওয়াই লিমিটেড এই প্রকল্পের প্রধান অর্থায়নকারী হিসেবে কাজ করছে। সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ‘ল্যান্ডলর্ড মডেল পিপিপি’ কাঠামোর অধীনে প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত ২০০ একর জমি এবং স্থাবর সম্পত্তির শতভাগ মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে সংরক্ষিত থাকবে। চুক্তি শেষে সব অত্যাধুনিক অবকাঠামো স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় হস্তান্তর হবে।

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বৈশ্বিক শিপিং ট্রাফিকের সাথে কৌশলগত সংযোগ

দেশের অন্যান্য বন্দরসহ মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বঙ্গোপসাগর এলাকায় চলাচলকারী বিশালাকার বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর মেন্ডেটরি ডকিং অ্যান্ড রিপেয়ার ফ্যাসিলিটি নিশ্চিত করণ এবং যেকোনো জরুরি যান্ত্রিক ত্রুটি দ্রুত মেরামতের জন্য এই ডকইয়ার্ড একটি অপরিহার্য বন্দর সুবিধা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে। এর ফলে এ অঞ্চলে চলাচলকারী এবং দেশের বন্দর চ্যানেলে দুর্ঘটনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কোনো জাহাজকে চ্যানেলে আটকে থাকতে হবে না। ফলে, বন্দরের অপারেশনাল নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ জাহাজ মালিক, অংশীজন ও মেইন লাইন অপারেটরদের মূল্যবান সময় ও অর্থ সাশ্রয় হবে।

সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এই ডকইয়ার্ডে নির্মিতব্য ৬০০ মিটার দীর্ঘ ও ৯৫ মিটার প্রশস্ত ফ্ল্যাগশিপ ড্রাইডকটি ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরে চলাচলকারী বিশালাকার বৈশ্বিক জাহাজগুলোকে অনায়াসে ডকিং ও মেরামত সুবিধা দিতে পারবে। আগে এ ধরনের ভারী মেরামতের জন্য জাহাজগুলোকে সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা চীনের বন্দরে যেতে হতো। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ নিজেই এই অঞ্চলের একটি প্রধান সামুদ্রিক সেবা কেন্দ্রে পরিণত হবে এবং বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও উপার্জন সম্ভব হবে।

গ্রীন ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন

দেশের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ‘গ্রিন ডকইয়ার্ড’ হিসেবে এই প্রকল্পে পরিবেশ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের গ্রীন ইনিসিয়েটিভ The Net Zero Framework ও Green Voyage 2050 এবং ISO-এর কঠোর পরিবেশগত মানদণ্ড বজায় রেখে এতে লো-এমিশন শক্তি ব্যবস্থা, ক্লোজড-লুপ বর্জ্য পানি শোধন ব্যবস্থা এবং বিপজ্জনক রাসায়নিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করা হচ্ছে। প্রকল্পটির রূপরেখা জাতিসংঘের একাধিক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সাথে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এর মধ্যে এসডিজি ৯ (শিল্প, উদ্ভাবন ও অবকাঠামো): এটি দেশে একটি স্থিতিশীল, পরিবেশবান্ধব ও যুগোপযোগী ভারী সামুদ্রিক শিল্প অবকাঠামো গড়ে তুলবে এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি স্থানান্তর নিশ্চিত করবে।

এসডিজি ৮ (শোভন কর্ম ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি): প্রকল্পটির মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ জন দক্ষ প্রকৌশলী ও কারিগরের সরাসরি কর্মসংস্থান এবং অতিরিক্ত ২ হাজার ৬০০ জনের পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

এসডিজি ১৩ (জলবায়ু কার্যক্রম): নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর পরিবেশবান্ধব রূপান্তরে এই কেন্দ্রটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

এসডিজি ১৪ (জলজ জীবন রক্ষা): উন্নত ইকো-ফ্রেন্ডলি ডাই ডকিং এবং আধুনিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে মহেশখালী ও কক্সবাজার অঞ্চলের উপকূলীয় সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্রা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকবে।

অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও আঞ্চলিক সুবিধা

এই ডকইয়ার্ড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মহেশখালী ও মাতারবাড়ী অঞ্চল ঘিরে সরকার কর্তৃক যে বিশাল শিল্প ক্লাস্টার, এনার্জি, পোর্ট অ্যান্ড লজিস্টিকস হাব গড়ে উঠছে তাতে এই গ্রীন ডকইয়ার্ড অন্যতম কি সাপোর্ট ইনস্টলেশন হিসেবে গড়ে উঠবে। স্থানীয় প্রকৌশল শিল্প, ইস্পাত তৈরি, লজিস্টিকস এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি সামুদ্রিক সাপ্লাই চেইন ব্যবসায় এর মাধ্যমে জোয়ার আসবে। একই সাথে দেশ-বিদেশের বাণিজ্যিক ফ্লিটসহ বাংলাদেশ নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ডের জাহাজগুলো দেশের মাটিতেই বিশ্বমানের মেরামত সুবিধা পাবে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার এই প্রেক্ষাপটে, এই যৌথ উদ্যোগটি কেবল একটি শিল্প অবকাঠামো তৈরি করছে না বরং এটি বাংলাদেশের মেরিটাইম সেক্টরে একটি অত্যন্ত আধুনিক উদ্ভাবনী বিনিয়োগ উদ্যোগ হিসেবে ভূমিকা রাখছে। সম্পূর্ণ স্বনির্ভর এবং রাষ্ট্রীয় ঋণঝুঁকিমুক্ত এই পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেলটি প্রমাণ করে যে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বৈশ্বিক ব্লু-ইকোনমি ও পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের সাথে তাল মিলিয়ে নতুন কৌশলগত নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পর প্রকল্পটির কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নের কাজ এখন পিপিপি কর্তৃপক্ষের অধীনে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। সম্পূর্ণ বেসরকারি অর্থায়নে এবং সরকারের কোনো প্রকার ঋণঝুঁকি ছাড়াই বাস্তবায়িত হতে যাওয়া এই মেগা-প্রকল্পটি বাংলাদেশের ব্লু-ইকোনমি ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে কয়েক দশক এগিয়ে রাখবে।

Advertisement