বেশি মুনাফার জন্য পদ্মা ব্যাংকে রাখা ১৮০ কোটি টাকা শেষ পর্যন্ত জলেই যেতে বসেছে। বন্দরের নিজস্ব তহবিলের এই বিপুল টাকা ২০১৫ সালে রাজনৈতিক চাপে পড়ে অনিয়মের মাধ্যমে ব্যাংকে জমা হয়েছিল। ব্যাংকের এখন আর্থিক যে নাজুক অবস্থা তাতে মুনাফা দূরে থাক, মূল টাকা ফেরত পাওয়া নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বন্দরের অডিট বিভাগ বলছে, এই ১৮০ কোটি টাকা ১ থেকে ৩ বছর মেয়াদে পদ্মা ব্যাংকে আমানত রাখা হয়েছিল। তখন ব্যাংকটি ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যা সাধারণ ব্যাংকের মুনাফার চেয়ে অনেক বেশি। সেই লোভ দেখিয়ে টাকাটা ব্যাংকে রাখা হয়েছিল বাছবিচার ছাড়াই।
গাণিতিক হিসাবে ১০ বছর ধরে এই ১৮০ কোটি টাকা যদি ১২ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি হারে জমা থাকত, তবে মুনাফাসহ মোট টাকা হতাে প্রায় ৫৬০ কোটি টাকা। আজকের দিনে এসে বন্দর শুধু আসল নয়, প্রায় ৩৮০ কোটি টাকার সম্ভাব্য মুনাফাও হারিয়েছে।
বন্দরসচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেছেন, ‘টাকা উদ্ধারে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি; কিন্তু সাড়া নেই।’
বন্দর কর্তৃপক্ষ বছরে আয়-ব্যয় শেষে উদ্বৃত্ত টাকা বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংকে বিনিয়োগ করে থাকে। আর এই বিনিয়োগের টাকা থেকে আয়কৃত অর্থ দিয়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে, অবকাঠামো বানায়, যন্ত্রপাতি কিনে।
বন্দর ব্যবহারকারী ও শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি মশিউল আলম স্বপন বলেছেন, ‘২০২২ সালে এনসিটির জন্য কেনা কি গ্যান্ট্রি ক্রেনের দাম ৬০ কোটি টাকা। সে হিসাবে ৫৬০ কোটি টাকায় ৯টি কি গ্যান্ট্রি ক্রেন কিনে বন্দরের চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) আধুনিক টার্মিনালে রূপান্তর করা যেতা। বন্দরের আয়ের টাকা দেশের স্বার্থে ব্যবহার না করেই ব্যক্তিস্বার্থে এভাবেই তছনছ করা হয়েছিল।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের অর্থ জমা রাখার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক প্রাধান্য পাবে। আর বেসরকারি ব্যাংকে রাখতে হলে ব্যাংকের নির্দিষ্ট রেটিং ও ক্যাটাগরি বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। ২০১৫ সালের যে সময়ে টাকা রাখা হয়েছিল, তখন পদ্মা ব্যাংক ফারমার্স ব্যাংক নামে ছিল। তখন ব্যাংকটি ছিল ‘রেড জোন’ বা উচ্চঝুঁকিপূর্ণ তালিকায়।
তখন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিন খান আলমগীর। ব্যাপক অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি এবং তারল্য সংকট দেখা দিলে বাংলাদেশ ব্যাংক সেই ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছিল। পরে ২০১৮ সালে ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তন হয়ে আরেক আওয়ামী লীগ নেতা চৌধুরী নাফিজ সরাফাত চেয়ারম্যান হন। আর নাম পরিবর্তন হয়ে পদ্মা ব্যাংক হয়। বর্তমানে ব্যাংকের বেশিরভাগের শেয়ারের মালিক সরকারি পাঁচটি ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠান।
পদ্মা ব্যাংকে বন্দরের টাকা জমা দেওয়ার সময় ২০১৫-১৬ সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন রিয়ার অ্যাডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ। যিনি পরে নৌবাহিনীপ্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন। বন্দরের বিগত পাঁচটি বার্ষিক অডিট রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, তৎকালীন বন্দর বোর্ড ও অর্থ বিভাগ ঝুঁকি মূল্যায়ন না করেই এই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। অডিট প্রতিবেদনে বিষয়টিকে ‘আর্থিক অনিয়ম’ ও ‘অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়ী করা হয়েছে।
পদ্মা ব্যাংক বর্তমানে তীব্র তারল্য সংকটে ভুগছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ বিগত ছয় বছর ধরে টাকা ফেরতে বারবার চিঠি দিলেও কোনো সাড়া নেই। সরকারি কয়েকটি ব্যাংকের শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে নাজুক পদ্মা ব্যাংক চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু নগদ অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা তাদের নেই। বর্তমানে এই ১৮০ কোটি টাকা ‘অনাদায়ী পাওনা’ হিসেবে বন্দরের ব্যালেন্স শিটে ঝুলে আছে।
২০২৪ সালে এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে পদ্মা ব্যাংকের একীভূত হওয়ার একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলে কয়েক মাস পর এক্সিম ব্যাংক সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
ব্যাংকটির পুঞ্জীভূত লোকসান বর্তমানে ৬ হাজার ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে আর মূলধন ঘাটতি ৫ হাজার কোটি টাকা। এই অবস্থায় নিজেই অস্তিত্ব সংকটে আছে পদ্মা ব্যাংক।
















