নেজাম উদ্দিন রানা: সাপ্তাহিক হাটের দিন গুটিকয়েক ব্যাবসায়ী অল্প কিছু শাকসবজি ও নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রির উদ্দেশ্যে বসে বসে অলস সময় পার করছে। বর্তমান হাটের এমন দৈন্যদশা দেখে বুঝার উপায় নেই, এক সময় রাউজান উপজেলার উরকিরচর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী কেরানিহাটে লোকে গিজগিজ করতো। সাপ্তাহিক হাটের দিন ছাড়াও প্রতিদিন উপজেলার উরকিরচর ও পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষের আনাগোনায় মুখড়িত থাকতো সকাল থেকে গভীর রাত অবধি। কালের আবর্তে কেরানিহাটের সেই সোনালী ঐতিহ্য ম্রিয়মান হলেও উপজেলার সবচেয়ে পুরনো এই বাজারে মাথা উঁচু করে আজও দাড়িয়ে আছে ৩৫০ বছরের পুরনো রেইনট্রি গাছ। সময়ের আবর্তনে অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও গাছটি যেন কালের স্বাক্ষী হয়ে চারদিকে শাখা-প্রশাখা প্রসারিত করে স্বমহিমায়
ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। সুশীতল ছায়াতলে আগলে রেখেছে পুরো বাজারটিকে।
ভোর, পড়ন্ত বিকেল কিংবা সন্ধ্যা থেকে গভীর রাতেও নাম জানা অজানা শত শত পাখিদের কলতান আর কিচিরমিচির শব্দের মূর্ছণায় মুগ্ধতায় মাতিয়ে রাখেন বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতা, পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কেরানিহাট বাজার রাউজানের খুবই প্রসিদ্ধ ও জমজমাট ছিল এক সময়। নব্বই দশকের দিকে বাজারটি সবসময় ক্রেতা-বিক্রেতাদের আনাগোনা সরগরম থাকতো। বিশাল রেইনট্রি গাছটি বড় বড় শাখা-প্রশাখায় পুরো বাজারকে আচ্ছন্ন রাখতো সুশীতল ছায়াতলে। চার দশক পূর্বে বাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুরো বাজারের দোকানপাট ভস্মীভূত হয়ে আগুনের কুন্ডলীতে ঐতিহ্যবাহী রেইনট্রি গাছের অনেক ডালপালা পুড়ে যায়।
পরবর্তীতে এই বাজারের চিরচেনা ব্যস্ততা হারিয়ে যায় কালের আবর্তে। বর্তমানে পুরনো ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে বাজারে ৫০/থেকে ৫৫ টি দোকান চালাচ্ছেন ব্যাবসায়ীরা।
কেরানিহাট বাজার পরিচালনা কমিটির সভাপতি, সাবেক ইউপি সদস্য তাপস বড়ুয়া বলেন, কেরানিহাট বাজারের রেইনট্রি গাছটি অন্তত তিন থেকে সাড়ে তিন শতাধিক বছর ধরে দেখছেন স্থানীয় লোকজন। রাউজানের ঐতিহ্যবাহী বাজার কেরানিহাট কালের পরিক্রমায় তার রূপ-যৌবন হারালেও রেইনট্রি গাছটি যেন ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে আছে।
বাজারের ব্যাবসায়ী এস.এম রাজু বলেন, রাউজানের কেরানিহাট বলতেই চোখের সামনে বিশাল রেইনট্রি গাছটি ভেসে উঠে। এখনো অনেক মানুষ কেরানিহাটে ছুটে আসে কেবল গাছটির সুশীতল ছায়াতলে পড়ন্ত বিকেলে আড্ডা দেওয়ার জন্য।
অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য পুলক বড়ুয়া বলেন, ছোটবেলা থেকেই কেরানি হাটে সাপ্তাহিক বাজার করতে ছুটে যেতাম। বিশাল রেইনট্রি গাছটি যেন পুরো হাটকে আগলে রাখতো। শৈশবের স্মৃতি বিজড়িত হাট জৌলুশ হারালেও এখনো সেই গাছের টানে সময় ও সুযোগ পেলেই আমরা বন্ধুদের নিয়ে গাছটির ছায়াতলে বসে আড্ডা দিই।
কেরানি হাটের প্রবীণ ব্যাবসায়ী সত্তরোর্ধ দীলিপ বড়ুয়া বলেন, শৈশব থেকেই বিশাল রেইনট্রি গাছটি দেখে দেখে বড় হয়েছি। অনেক ডালপালা ভেঙে পড়লেও গাছটি যেন কালের স্বাক্ষী। পূর্ব পুরুষদের কাছ থেকে এই গাছ নিয়ে অনেক কাহিনি শুনেছি।
রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস.এম রাহাতুল ইসলাম বলেন, উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে রাউজানের ঐতিহ্যবাহী কেরানিহাটে কিছু উন্নয়ন কাজ হয়েছে। আগামীতেও কেরানিহাটসহ রাউজানের যে সকল প্রাচীণ বাজার রয়েছে সেগুলোর উন্নয়নে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

















