শহরের পরিবারে নীরব ভাঙন

34

পুরান ঢাকার সরু গলি। একটু এগোলেই ছোট্ট বাসা। সেখানেই তিন সন্তানকে নিয়ে শিউলির (ছদ্মনাম) বাস। বয়স সবে ২৮। অথচ জীবনের বড় অধ্যায় যেন দেখা শেষ। শিউলির বয়স তখন ১৬। পরিবারের সিদ্ধান্তে ১৪ বছর বড় কামালের (ছদ্মনাম) সঙ্গে বিয়ে হয় তার। নিশ্চিত জীবনের আশায় বিয়ের পিঁড়িতে বসা শিউলির পড়া আটকে যায় নবম শ্রেণিতে। বিয়ের প্রথম বছরে প্রথম সন্তান, তারপর আরও দুই। শুরুটা সুন্দর হলেও ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে কামালের আচরণ। রাতে দেরিতে ঘরে ফেরা, ফোন লুকিয়ে কথা বলা, অকারণে রাগারাগি ছিল নিত্য ঘটনা। পরের ধাপে শুরু হয় গায়ে হাত তোলা, সন্তানদের সামনে অপমান করা। সেইসঙ্গে কমে আসতে থাকে সংসারের খরচ দেওয়া। এসবের মধ্যে শিউলির কানে আসে অন্য নারীর সঙ্গে স্বামীর সম্পর্কের কথা। প্রতিবাদ করলেই কামাল বলত, ‘তোমাকে আর ভালো লাগে না, সঙ্গে চলত অমানবিক নির্যাতন।’ সব চুপ সহ্য করে যাওয়া শিউলির হাতে এক দিন তালাকের কাগজ ধরিয়ে দেন কামাল। এখন সেলাই আর অন্যের বাসায় রান্নার কাজ করে জীবনযুদ্ধ চলছে তার। শিউলির ভাষায়, ‘ডিভোর্স শুধু দুজন মানুষের মধ্যে হয় না। বাচ্চাদের জীবনও ভেঙে যায়।’

Advertisement

শিউলি-কামালের মতো সব বিচ্ছেদের নেপথ্যে শারীরিক নির্যাতন বা পরকীয়ার ঘটনাই থাকে না। অনেক সম্পর্ক ভাঙে জমে ওঠা নীরব দূরত্ব, ব্যস্ততা আর একে অপরের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলার কারণে। এক ঘরে থেকেও যেখানে দুজন মানুষ ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে অচেনা।

কলেজ জীবনের দ্বিতীয় বর্ষে পরিচয় হয়েছিল রুমানা ও হাবিবুরের। একই ক্লাস, বন্ধুদের আড্ডা, টিফিন ভাগাভাগি আর ছোট ছোট অভিমান মিলিয়ে তৈরি হয় তাদের গভীর সম্পর্ক। দুজনেই একই বর্ষের শিক্ষার্থী হওয়ায় শুরু থেকে সম্পর্কটা মেনে নিতে চায়নি পরিবার। ধারণা ছিল, সমবয়সী দুজন মানুষের সংসার টিকবে না। তবুও প্রায় ১০ বছরের সম্পর্কের পর পরিবারের মতের বাইরে গিয়ে বিয়ে করেন তারা। পরে দুই পরিবার বিষয়টি মেনে নিলেও সম্পর্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। বিয়ের পর ঢাকার একটি ছোট ফ্ল্যাটে সংসার শুরু করেন রুমানা ও হাবিবুর। দুজনেই চাকরি করতেন। শুরুতে সবকিছুই ছিল সুন্দর। অফিস শেষে একসঙ্গে বাসায় ফেরা, ছুটির দিনে ঘুরতে যাওয়া, মাঝরাতে গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়া—সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের বন্ধুত্ব। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের ভেতরে অদৃশ্য এক দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। যেন প্রয়োজন ছাড়া আর কথা হতো না।

বিয়ের কয়েক বছর পার হলেও তাদের সন্তান হচ্ছিল না। আত্মীয়স্বজনের নানা কথা আর ইঙ্গিত রুমানাকে প্রতিনিয়ত আহত করত। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হতো, যখন এসব মুহূর্তে হাবিবুর চুপ থাকতেন। রুমানা বুঝতে পারেন, তারা আর স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বেঁচে নেই। একই বাসায় থাকা দুজন ক্লান্ত মানুষ হয়ে গেছেন শুধু। সেখানে না আছে বোঝাপড়া, না আছে সম্মান। শেষ পর্যন্ত তিনিই বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন।

রাজধানী ঢাকায় দাম্পত্য সম্পর্কের ভাঙন এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং একটি ধারাবাহিক সামাজিক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত তিন বছরে ঢাকায় মোট ৪৩ হাজার ৭৪টি তালাকের আবেদন হয়েছে। সবচেয়ে বেশি চাপ বহন করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এখানে তিন বছরে মোট ২৭ হাজার ৪২টি তালাকের আবেদন হয়েছে, যা উত্তর সিটির তুলনায় ১০ হাজারের বেশি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে এ সংখ্যা ১৬ হাজার ৩২টি। দক্ষিণ সিটিতে প্রতি বছরই গড়ে সাত থেকে আট হাজারের বেশি তালাক হয়েছে। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা পৌঁছায় ৮ হাজার ৮৬৬টিতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ঢাকায় উচ্চশিক্ষিত ও কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা বেশি হলেও সেটিই সরাসরি ডিভোর্সের কারণ নয়। মূল সমস্যা হচ্ছে পারস্পরিক সহনশীলতা, ধৈর্য ও যৌথ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মানসিকতা কমে যাওয়া।

তিনি বলেন, বর্তমানে অনেকের মধ্যে নিজের মতামতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রী দুজনই কর্মজীবী হলে মতবিরোধ ও মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও পরকীয়ার প্রবণতাও বিচ্ছেদের অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে।

উত্তরে শীর্ষে মিরপুর-গুলশান, আবেদন বেশি নারীদের: ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, তালাক আবেদন এবং কার্যকর দুই ক্ষেত্রে মিরপুর, কারওয়ান বাজার ও গুলশান এলাকা শীর্ষে রয়েছে। এখানে ২০২৩ সালে ৩ হাজার ৯২২টি তালাক কার্যকর হয়। পরের বছর তালাক হয় ৪ হাজার ২২টি। আর গত বছর ২০২৫ সালে ৩ হাজার ৯৫০টি তালাক হয়।

পর্যবেক্ষণে পাওয়া যায়, উত্তর সিটিতে নারীদের তালাক আবেদন পুরুষদের তুলনায় বেশি, যা অনেক ক্ষেত্রে মোট আবেদনের অর্ধেকের বেশি। ২০২৩-২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরেই নারীদের আবেদন পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। ২০২৩ সালে মোট ৫ হাজার ১৮৫টি তালাকের মধ্যে পুরুষদের আবেদন ছিল ২ হাজার ১৬৭টি, আর নারীদের ৩ হাজার ২৪১টি। ২০২৪ সালে এ ব্যবধান আরও বাড়ে, যেখানে মোট ৫ হাজার ৫২১টি তালাকের মধ্যে নারীদের আবেদন সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ হাজার ৪৪৯টিতে। ওই বছর তালাকের জন্য আবেদন করেছিলেন ১ হাজার ৯৯০ জন পুরুষ। ২০২৫ সালে ৫ হাজার ৩২৬টি তালাকের মধ্যে নারীদের আবেদন ৩ হাজার ৭৭২টি এবং পুরুষদের ২ হাজার ৪৭১টি।

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি, সম্পর্ক নিয়ে অসন্তুষ্টি সহ্য না করার প্রবণতা এবং অধিকার সম্পর্কে নারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি এ পরিবর্তনের পেছনে কাজ করছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, নারীর অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া কোনোভাবেই দোষের কিছু নয়। নির্যাতন থেকে মুক্তির জন্য একজন নারী চাইলে ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিতেও পারেন।

তিনি বলেন, পারিবারিক দায়িত্বের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমান অংশীদারত্ব এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এখনো শ্রমের ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন দেখা যায়, কোন কাজ নারীর, কোন কাজ পুরুষের—এমন ধারণা সমাজে গভীরভাবে রয়ে গেছে।

ডা. ফওজিয়া মোসলেম আরও বলেন, একজন নারী যদি নিজে কষ্ট করে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হন এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হন, কিন্তু পারিবারিক সহায়তা বা ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন না আসে, তাহলে তার জন্য কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তার মতে, পরিবার পরিচালনায় কাঠামোগত যে পরিবর্তন প্রয়োজন, সেটির দিকেই এখনো যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে না। এ পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়িত হলে নারীরা আরও স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারবেন এবং একই সঙ্গে বিচ্ছেদের হারও কমে আসবে।

সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দাম্পত্য বিচ্ছেদের পেছনে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি, সম্পর্কে অসন্তুষ্টি সহ্য না করার প্রবণতা এবং বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের মতো বিষয়গুলো বেশি প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ায় অনেকেই এখন আর নির্যাতন, অসম্মান বা দীর্ঘদিনের মানসিক অশান্তি মেনে নিতে চাইছেন না।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আয়, সামাজিক অবস্থান বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন এলেও মানসিকতার পরিবর্তন সেভাবে না হওয়ায় দাম্পত্য সম্পর্কে দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পুরুষের তুলনায় বেশি হলে কিছু পরিবারে আধিপত্যের সংঘাত, অহংবোধ ও মানসিক দূরত্ব বাড়ছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের সুযোগ বাড়ায় বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ঘটনাও আগের তুলনায় বেশি সামনে আসছে। পারিবারিক দ্বন্দ্ব, একে অপরকে সময় না দেওয়া, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কমে যাওয়া এবং ছোট ছোট বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ থেকেও অনেক সম্পর্ক বিচ্ছেদের দিকে গড়াচ্ছে।

আইনজীবীরা বলছেন, অনেক নারী স্বেচ্ছায় নয়, বরং দীর্ঘদিনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কারণে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। অনেক ক্ষেত্রে স্বামীর পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়, অপমান-অবহেলা কিংবা নির্যাতনের মাধ্যমে স্ত্রীকে ডিভোর্স দিতে বাধ্য করা হয়। পারিবারিক চাপ, সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার মতো বিষয়ও নারীদের বিচ্ছেদের পথে ঠেলে দিচ্ছে।

ঢাকা উত্তরের চেয়ে দক্ষিণে তালাক বেশি: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিসংখ্যান যেন শুধু তালাকের হিসাব নয়, বরং একটি পুরো শহরের ভেতরে জমে থাকা সম্পর্কের ক্লান্তি, নীরবতা আর ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে যাওয়ার গল্প। ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এ সিটিতে মোট তালাকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৪২টিতে।

তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে যেখানে তালাকের সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৫৩০টি, ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৭ হাজার ৬৯৫টিতে পৌঁছে। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৮৬৬টিতে। আর ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই তালাক কার্যকর হয়েছে ২ হাজার ৯৫১টি।

পারিবারিক আদালতের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মলয় সাহা বলেন, সমাজ ও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে দেশে তালাকের সংখ্যাও বাড়ছে। আগে নারীরা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে নির্ভরশীল থাকায় অনেক নির্যাতন সহ্য করতেন। এখন শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সচেতনতা বাড়ায় তারা নিজেদের অধিকার নিয়ে আরও সোচ্চার হচ্ছেন। তিনি বলেন, সমাজ এখনো পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তবে পারিবারিক মানসিকতার পরিবর্তন সে তুলনায় ধীর। অনেক ক্ষেত্রে দাম্পত্য দ্বন্দ্বের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে সন্তানদের ওপর। তার মতে, সামাজিক পরিবর্তন, নারীর ক্ষমতায়ন ও আধুনিক জীবনের বাস্তবতাই বর্তমানে তালাক বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

Advertisement