দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৫ সালের ৬ আগষ্ট হিরোশিমা ও ৯ আগষ্ট নাগাসাকি শহরে যখন পারমাণবিক বোমার আঘাতে পৃথিবী কাঁদছিলো এবং পরবর্তী সময়ে চারদিকে যুদ্ধ নয় শান্তি চাই এই শ্লোগানে শান্তির পতাকার মিছিল চলছে, ঠিক ঐ মুহুর্তে ইস্কান্দার মজুমদার ও তৈয়বা মজুমদারের ঘরে আলোকিত করে পৃথিবীতে যেন শান্তির দূত হয়ে জন্ম নিলেন ফুটফুটে এক শিশু কন্যা। কে জানতো আজ ৭৫ বছর বয়সী সেদিনের শিশুকন্যাটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জননী হিসেবে আবির্ভূত হবেন!
শরতের স্নিগ্ধ ভোরে জলপাইগুড়ির ছোট্ট শহর নয়াবস্তি এলাকায় ১৯৪৫ সালের ১৫ আগষ্ট জন্ম নেওয়া শিশুকন্যাটির নাম রাখা হয়েছিলো খালেদা খানম। অনেকেই নাম রাখতে চাইছিলেন শান্তি। যেহেতু তাঁর জন্মের পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা থেমে পৃথিবীতে শান্তি বিরাজ করছিলো।
এই শিশুকন্যাটির জন্মের পর পৃথিবীতে শান্তি নেমে আসলেও নিজ জীবনে অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে, কঠিন সংগ্রাম, ত্যাগ ও শ্রম বিসর্জন দিয়েছেন নিজের জন্য সর্বপরি দেশ ও জাতির জন্য। ৪০০ টাকা বেতনের একজন অখ্যাত মেজরের স্ত্রী হওয়ার দরুন তাঁকে জীবনের প্রথম বন্দীদশায় পড়তে হয় পাকিস্তান সেনাবাহিনী দ্বারা। কারণ তাঁর স্বামী ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। নিজের সুনিশ্চিত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে দেশের জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা ছিলো তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে পাক আর্মির অভিযোগ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বামীকে ফিরে পেলেও ১৯৮১ সালে দেশদ্রোহী ও দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রে নির্মমভাবে শহীদ হোন তাঁর স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। এর পর ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের হাল ধরেন বেগম খালেদা জিয়া।
বেগম খালেদা জিয়া তাঁর স্বামীকে ২১টি বছর ধরে কাছ থেকে দেখেছেন। একজন সৈনিক জিয়া, স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়া, একজন রাজনীতিবিদ ও একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক জিয়াকে দেখেছেন তিনি। দেখেছেন তাঁর সুনিপুণ কাজ। একটি দলকে ভূমিষ্ট হবার পর থেকে কতো কষ্ট করে গড়ে তুলতে হয় বেগম খালেদা জিয়া তাঁর স্বামীর কাছ থেকে দেখেছেন।
বিএনপির কর্মী থেকে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৮৪ সালের ১০ মে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তাঁর বলিষ্ঠ ভুমিকা অনস্বীকার্য। দেশকে স্বৈরাচার মুক্ত করেছিলেন আপোষহীন সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে। স্বৈরাচার এরশাদ আমলেও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দুবার কারাবন্দী হন।
এরপর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে বিএনপি। ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ বাংলাদেশের প্রথম ও বিশ্বের ৮ম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন আপোষহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ২ এপ্রিল তিনি সংসদীয় সরকার পদ্ধতি বিল পাশ করেন। এরপর ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে জাতীয় সংসদে আবির্ভূত হন। আবার ২০০১ সালে আবারও একক সংখ্যাগরিষ্ট দল হিসেবে সরকার গঠন করেন এবং প্রধানমন্ত্রী হন বেগম খালেদা জিয়া। ২০০৬ সালে রাষ্ট্রক্ষমতা ছাড়ার পর আবার ১/১১ এর সেনাবাহিনী সমর্থিত সরকার জোর করে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহন করে। ২০০৬ সালে ১/১১ সরকার আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে আটক করলে তাঁর মুক্তি দাবী করেন খালেদা জিয়া। তবে ২০০৭ সালে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে আবারও কারারুদ্ধ করে রাখে ১/১১ এর সরকার। ২০০৮ সালে তিনি মুক্তিলাভের পর বিদেশ না গিয়ে ১/১১ সরকারকে একরকম পরাস্ত করেন তিনি। এরপর ২০১৮ সালে আবারও তাঁকে মিথ্যা ও সাজানো রায়ে কারাবরণ করতে হয়। প্রায় ২ বছর মিথ্যা কারাভোগের পর বর্তমান সরকার তাঁকে অন্তবর্তীকালীন জামিন দেয়। কিন্তু ২ বছর কারাগারে থাকাকালীন সময়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন তিনি।
বিশেষকরে রাজনীতিতে প্রবেশের পর থেকেই নানা প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েও কোনদিন দেশ ও জাতির স্বার্থে আপোষ করেননি তিনি। অন্যায়ের সাথে আপোষ করেন নিয়ে বলেই তাঁকে বারবার কারানির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। তবুও গণতন্ত্র রক্ষায় রাজপথে বারবার সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি সবসময় দেশের ন্যার্য্য দাবী নিয়ে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সরাসরি বক্তব্য রেখেছেন। তাই একথা বলতে দ্বিধা নেই যে, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের প্রতীক।
আজ ১৫ আগষ্ট বিএনপি চেয়ারপার্সন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ৭৭ তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু প্রার্থনা করছি পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার কাছে।
সৌরভ প্রিয় পাল,
সাবেক সহ-সভাপতি,
চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদল।















