সপ্তাহব্যাপী অতিভারী বর্ষণ থামার পর চট্টগ্রাম অঞ্চলের নিম্নাঞ্চল থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। পানি সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামনে আসছে বন্যার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। কোথাও ডুবে গেছে পাকা আউশ ধান, কোথাও নষ্ট হয়েছে আমনের বীজতলা, আবার কোথাও পানিতে ভেসে গেছে মাছের ঘের কিংবা মারা গেছে গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ–এই তিন খাত মিলিয়ে বন্যা বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদন ও বাজারে নতুন অনিশ্চয়তার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের গতকাল মঙ্গলবারের তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার পর্যন্ত দেশের ৪৩টি জেলার কৃষি খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৭২৩ হেক্টর জমি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৫ লাখের বেশি কৃষক। একই সময়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আউশ ধান, আমনের বীজতলা ও মৌসুমি সবজি। ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়লে আগামী কয়েক মাসে খাদ্য সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে সবজি ও ধানের বাজারে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
১৬ জেলাতেই ৯০ শতাংশ ক্ষতি
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৬টি জেলা। এগুলো হলো চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, কুমিল্লা, হবিগঞ্জ, নওগাঁ, যশোর, মেহেরপুর, বাগেরহাট, বরগুনা, ভোলা, বরিশাল, ঝালকাঠি ও পটুয়াখালী। এসব জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত ফসলি জমির পরিমাণ ১ লাখ ৭ হাজার ৪২৫ হেক্টর, যা সারাদেশে ক্ষতিগ্রস্ত জমির ৯০ শতাংশেরও বেশি। শুধু এ ১৬ জেলাতেই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৭৬ জন। মোট ক্ষতিগ্রস্ত জমির মধ্যে ৭৯ হাজার ৫০০ হেক্টর আউশ ধান, ১০ হাজার ৫০৪ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ১৭ হাজার ৮০০ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজির জমি রয়েছে। এ ছাড়া আদা, হলুদ, পেঁপে ও অন্যান্য উচ্চমূল্যের ফসলও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাঠপর্যায়ে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি, ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ এবং পুনর্বাসনের পরিকল্পনাই এখন অগ্রাধিকার। তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে আমন ধানের বীজ, আগাম শীতকালীন সবজির বীজ ও প্রয়োজনীয় সার বিতরণের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করছে। মূল্যায়ন শেষ হলে দ্রুত সহায়তা দেওয়া হবে।
কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আমনের বীজতলায়। তবে আগামী ১৫ আগস্ট পর্যন্ত নতুন বীজতলা তৈরির সুযোগ রয়েছে। সরকারি জমিতে নতুন করে বীজতলা তৈরি করে সেখানকার চারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। এ কাজে বিএডিসি, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, এখনও ব্যাপক পরিসরে আমন রোপণ শুরু হয়নি। ফলে সময়মতো বিকল্প চারা সরবরাহ করা গেলে বড় ধরনের উৎপাদন ঘাটতি এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
মাছ ও গবাদি পশুতেও বড় ক্ষতি
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের গতকাল মঙ্গলবারের প্রতিবেদনে দেখা যায়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৯৯ কোটি ১২ লাখ টাকা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলা। এসব এলাকায় ১ লাখ ৫৭ হাজার ৩০০টি গরু, ৪ হাজার ১৪৮টি মহিষ, ১ লাখ ১২ হাজার ৬৫৫টি ছাগল, ২৪ হাজার ৭৯৫টি ভেড়া, ১১ লাখ ৯১ হাজার ২০টি মুরগি এবং ২৪ হাজার ২৮টি হাঁস বন্যার কবলে পড়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ৪৫টি গরু, ১২৩টি ছাগল, ৪০টি ভেড়া, ১ লাখ ১ হাজার ১৯৮টি মুরগি এবং ১ হাজার ৫২১টি হাঁস। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬৫টি গবাদি পশুর খামার ও ৬৩টি হাঁস-মুরগির খামার। নষ্ট হয়েছে ১১৮ টন গোখাদ্য।
অন্যদিকে ৬০২টি ইউনিয়নে ১২ হাজার ৪৩ টন সাদা মাছ, ১৪ হাজার টন চিংড়ি, ১৮ লাখ পোনা এবং ২৫৯ লাখ রেণু বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। মাছ ধরার জাল, নৌযান, পুকুর, ঘের, স্লুইসগেটসহ বিভিন্ন অবকাঠামোও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম এ সাত্তার মণ্ডল বলেন, অনেক কৃষক বিক্রির উদ্দেশ্যেও ধান ও সবজির বীজতলা তৈরি করেন। তাই বীজতলা নষ্ট হওয়া মানে শুধু উৎপাদন নয়, সরাসরি আয় হারানোও।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, আমনের বীজতলা আবার তৈরি করা সম্ভব হলেও পানিতে ডুবে যাওয়া আউশ ধানের ক্ষতি পূরণ করা যাবে না। বিশেষ করে মিল্ক স্টেজে থাকা ধান দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকলে ফলন প্রায় নষ্ট হয়ে যায়। তিনি বন্যাপ্রবণ এলাকায় বন্যাসহনশীল ব্রি ধান-১১০সহ অনুরূপ জাতের চাষ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, এ জাতের ধান ১৫ থেকে ২০ দিন পানির নিচে থাকলেও ফলন দিতে সক্ষম।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত আর্থিক সহায়তা না দিলে উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে চাল ও গম আমদানির প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে সবজি উৎপাদন কমে গেলে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়বে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বলেন, ক্ষয়ক্ষতির সঠিক মূল্যায়নের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর অভিযোজন এখন সময়ের দাবি। ভাসমান বীজতলা, উন্নত আগাম পূর্বাভাস এবং কৃষকের কাছে সময়মতো তথ্য পৌঁছে দেওয়া গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহমেদ বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় পর্যাপ্ত আমনের চারা রয়েছে। প্রয়োজন হলে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে সেসব চারা সরবরাহ করা সম্ভব। তবে পেঁয়াজ, মরিচসহ গ্রীষ্মকালীন সবজিতে ক্ষতির প্রভাব কিছুদিন বাজারে থাকবে।

















