দেশের প্রথম ও দক্ষিণ এশিয়ার নদী তলদেশের দীর্ঘতম সুড়ঙ্গ সড়ক কর্ণফুলী টানেল। চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ টানেলটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল ১০ হাজার ২৫৫ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের অক্টোবরে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর টানেলটি থেকে দৈনিক যে পরিমাণ টোল আদায় হচ্ছে তারচেয়ে বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মেটাতে। এই ঘাটতি সামাল দিতে সরকারের গচ্চা দিতে হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
চট্টগ্রাম শহরকে নদীর দক্ষিণ তীরের আনোয়ারা প্রান্তের সঙ্গে যুক্ত করে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে সংযুক্ত করেছে কর্ণফুলী টানেল। বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়িত এ টানেল নতুন অর্থনৈতিক করিডোর হয়ে ওঠার কথা থাকলেও বাস্তবতা পুরোপুরি ভিন্ন। ‘আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি’র এ প্রকল্পটি এখন সরকারের জন্য ‘বিষফোঁড়া’ হয়ে উঠেছে। আয়-ব্যয়ের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকায় ‘স্বপ্নের’ কর্ণফুলী টানেল এখন যেন হয়ে উঠেছে ‘দুঃস্বপ্ন’।
সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) ২০২৬ সালের প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, টানেল নির্মাণ প্রকল্পটির সমীক্ষায় ভুল ছিল। যে কারণে টানেলে এখন দৈনিক ১০ লাখ টাকা বা বছরে সাড়ে ৩৬ কোটি টাকা গচ্চা দিতে হচ্ছে।
শুধু তা-ই নয়, বিনা কারণে প্রকল্প এলাকায় সার্ভিস এরিয়ার নামে ৪৮৪ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে, মূলত প্রকল্পের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে সাময়িকভাবে স্থানীয়দের জমি নিয়ে বাংলো বা অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে অবৈধভাবে।
বর্তমানে দৈনিক গড়ে টোল আদায় হচ্ছে প্রায় ১২ লাখ টাকা, যা মাসে ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অন্যদিকে, দৈনিক পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় প্রায় ২২ লাখ টাকা। ফলে প্রতি মাসে গড়ে ৩ কোটি টাকা আর্থিক ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা বছরে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে ৩৬ কোটি টাকায়।—প্রকল্প দপ্তরের তথ্য
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পটি নেওয়ার সময় সঠিকভাবে সমীক্ষা করা হয়নি। ফলে সমীক্ষা প্রতিবেদনের সঙ্গে বর্তমানে যানবাহন চলাচলের বাস্তব তথ্য মিলছে না। যে কারণে টানেল পরিচালনা করা এখন সরকারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এছাড়া প্রকল্পের অনেক খাতে ব্যয়ের পর্যাপ্ত নথি নেই। আবার অনেক ক্ষেত্রে সরকারি বিধি অনুসরণ না করে অর্থছাড় করা হয়েছে।
কর্ণফুলী টানেলের মাসিক রাজস্ব আদায় পর্যালোচনায় দেখা যায়, সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রত্যাশিত দৈনিক ট্রাফিক ছিল ১৭ হাজার ৩৭৫টি যানবাহন। কিন্তু বাস্তবে বর্তমান দৈনিক গড় ট্রাফিক মাত্র ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার যানবাহন, যা প্রত্যাশার মাত্র ২৩ থেকে ২৬ শতাংশ।টানেলটির দৈনিক গড় ট্রাফিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, টানেল উদ্বোধন পরবর্তী সময়ে প্রথম তিন মাসে দৈনিক গড় ট্রাফিক ছিল ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার যানবাহন। অক্টোবর ২০২৩ থেকে ডিসেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত সেখান থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৯ কোটি ১৫ লাখ ৬৮ হাজার ৬০০ টাকা।
পরবর্তীতে জানুয়ারি ২০২৪-এ এসে টানেলের দৈনিক গড় ট্রাফিক ৪ হাজারে নেমে আসে, এরপর যা আরও কমে সাড়ে ৩ থেকে ৩ হাজারে নামে। আগস্ট ২০২৫ থেকে বিবেচনা করলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ হাজার গাড়ি যাতায়াত করছে এই সুড়ঙ্গপথে।
প্রকল্প দপ্তরের তথ্য অনুসারে, বর্তমানে দৈনিক গড়ে টোল আদায় হচ্ছে প্রায় ১২ লাখ টাকা, যা মাসে ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অন্যদিকে, দৈনিক পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় প্রায় ২২ লাখ টাকা। ফলে প্রতি মাসে গড়ে ৩ কোটি টাকা আর্থিক ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা বছরে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে ৩৬ কোটি টাকায়।
বর্তমানে টানেলটি থেকে যে পরিমাণ টোল আদায় হচ্ছে তা পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের মাত্র ৫৪ থেকে ৫৫ শতাংশ মেটাতে পারছে, যা প্রকল্পের আর্থিক টেকসই হুমকির মুখে ফেলেছে।
বর্তমান বাস্তবতায় আইএমইডি বলছে, কর্ণফুলী টানেলের টোল আদায়ে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করে আদায়ের দক্ষতা বৃদ্ধিসহ পণ্যবাহী ট্রাকের জন্য রুট ডাইভারশন আকর্ষণ কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সেতু বিভাগ। কর্ণফুলী টানেল পরিচালনায় ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে সেতু সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেন, ‘কর্ণফুলী টানেল যারা (তৎকালীন সরকার) করছে তারা এখন নেই। তবে আমরা সরকারের পক্ষে এটির পরিচালন ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পরিচালন ব্যয় কমিয়ে টানেলকে কীভাবে লাভজনক করা যায় সে বিষয়ে কাজ করা হচ্ছে।’
প্রকল্পের সমীক্ষায় যারা ভুল করেছেন তাদের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—জানতে চাইলে সেতু সচিব বলেন, ‘বিষয়টি বিচারাধীন। দুদক মামলা পরিচালনা করছে। সুতরাং বিচারাধীন বিষয়ে কথা না বলাই ভালো।’
কর্ণফুলী টানেল যারা (তৎকালীন সরকার) করছে তারা এখন নেই। তবে আমরা সরকারের পক্ষে এটির পরিচালন ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পরিচালন ব্যয় কমিয়ে টানেলকে কীভাবে লাভজনক করা যায় সে বিষয়ে কাজ করা হচ্ছে।—মোহাম্মদ আবদুর রউফ
আইএমইডি জানিয়েছে, কর্ণফুলী টানেলের যে টোল হার তা সমজাতীয় মেগা প্রকল্পের তুলনায় সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে নদীতে বিদ্যমান শাহ আমানত সেতুর টোলের হারের তুলনায় কার/জিপ গাড়ির টোল প্রায় ২ দশমিক ৬৬ গুণ, পিকআপ ও মাইক্রোবাসে ২ গুণ, বাস বা যাত্রী গণপরিবহনের (৩১ সিটের কম) ছোট বাসে প্রায় ৬ গুণ। শুধু বড় ট্রাক/ট্রেইলারের ক্ষেত্রে শাহ আমানত সেতু ও কর্ণফুলী টানেলের টোল হার কাছাকাছি।
পদ্মা ও যমুনা সেতুর তুলনায় কর্ণফুলী টানেলের টোল হার প্রায় তিন থেকে চারগুণ কম হলেও স্থানীয় পর্যায়ে শাহ আমানত সেতুর তুলনায় উচ্চ টোল হারের প্রভাব পড়েছে ট্রাফিক প্রবাহে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রত্যাশিত দৈনিক ১৭ হাজার ৩৭৫টি যানবাহনের বিপরীতে বাস্তবে চার থেকে সাড়ে চার হাজার যানবাহন পারাপার হচ্ছে। উচ্চ মাশুলের কারণে অনেক চালক টানেল ব্যবহার না করে সেতু দিয়ে ঘুরপথে যাতায়াত করছেন, যা রাজস্ব আয় কমিয়েছে। টোল হারের যৌক্তিক সমন্বয় করলে ট্রাফিক বাড়তে পারে বলে মনে করছে আইএমইডি।
সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগটির প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, সার্ভিস এরিয়াটি সাধারণ আন্ডারওয়াটার রোড টানেলের রক্ষণাবেক্ষণ বা অপারেশনের জন্য ৩০টি বাংলো, ভিভিআইপি স্যুট, ৪৮টি অ্যাপার্টমেন্ট, সুইমিং পুল, জিম কিংবা অ্যাম্ফিথিয়েটারের মতো সুবিধা প্রকল্পের মূল উদ্দেশের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
বর্তমানে বিশাল কমপ্লেক্সটির ব্যবহার না হওয়ায় এটি অব্যবহৃত রয়েছে ও অযত্নে নষ্ট হচ্ছে। ইউটিলিটি সিস্টেম (পাওয়ার, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ) মজবুতভাবে নির্মিত। সার্বক্ষণিক জেনারেটর ব্যাকআপ সুবিধা রয়েছে। তবে বর্তমানে ব্যবহার না থাকায় অযত্নে ছোটোখাটো মেরামতের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
তথ্য বলছে, টানেল ঘিরে মসজিদ, হেলথ সেন্টার ও মিউজিয়ামের অবকাঠামো ভালো অবস্থায় আছে। মূল কনভেশন সেন্টারে জানালার পানি চুইয়ে দেওয়ালে দাগ হতে দেখা গেছে। এগুলো প্রাইভেট সেক্টরে লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান, যা রক্ষণাবেক্ষণ ও বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়াবে।
আইএমইডি বলছে, সমুদ্র ও নদীর নিকটবর্তী এই এলাকা পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে সম্ভাবনাময়। সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে সার্বিকভাবে অবকাঠামোটি ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারবে।
টানেল নির্মাণ প্রকল্পে সবচেয়ে আলোচিত অনিয়মগুলোর একটি ল্যান্ডস্কেপিং ও বৃক্ষরোপণ (বাগান) খাতের ব্যয়। আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ খাতে ৪৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। কিন্তু সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) কিংবা প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদনে (পিসিআর) এমন কোনো কাজের উল্লেখই নেই।
কোথায় গাছ লাগানো হয়েছে, কতটুকু এলাকায় সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ হয়েছে কিংবা কীভাবে এ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে—এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর প্রকল্পের নথিপত্রে পাওয়া যায়নি। অডিট কর্তৃপক্ষ এ ব্যয়কে ‘গুরুতর আর্থিক অনিয়ম’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
উচ্চ মাশুলের কারণে অনেক চালক টানেল ব্যবহার না করে সেতু দিয়ে ঘুরপথে যাতায়াত করছেন, যা রাজস্ব আয় কমিয়েছে। টোল হারের যৌক্তিক সমন্বয় করলে ট্রাফিক বাড়তে পারে।—আইএমইডি
টানেলের জন্য ৫০৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে একটি সার্ভিস এরিয়া (৩০টি বাংলো)। কিন্তু আইএমইডির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, প্রকল্পের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে এ স্থাপনার প্রয়োজনীয়তার যথেষ্ট ভিত্তি পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, অর্ধহাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হলেও কেন এই স্থাপনা নির্মাণ করা হলো, তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা প্রকল্প নথিতে নেই। টানেলে যানবাহনের চাপ প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ায় এই সার্ভিস এরিয়ার ব্যবহারও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
প্রকল্প ব্যয়ের অস্বাভাবিকতার আরেকটি উদাহরণ বিদ্যমান একটি বাংলো সংস্কার। অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সংস্কারকাজে ব্যয় হয়েছে ১০ কোটি ২৭ লাখ টাকা। একটি বাংলো সংস্কারে এত অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা মেলেনি বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ছিল চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। অভিযোগ আছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। মূল্য সমন্বয়ের নামে বিধিবহির্ভূতভাবে ২২৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। একই ধরনের আরেকটি আপত্তিতে আরও ৪২ কোটি ২৬ লাখ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধের তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রকৃত ব্যয়ের ভিত্তিতে অর্থছাড় না করে প্রভিশনাল সাম (আনুমানিক বাজেট) থেকে অতিরিক্ত ৯০ কোটি ২৭ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। আবার যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই ৭৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ভেরিয়েশন অর্ডার জারি করা হয়েছে, যা সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর-২০০৮) লঙ্ঘনের শামিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের পাশাপাশি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির শর্তও কার্যকর করা হয়নি। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করলেও আদায় করা হয়নি বিলম্বজনিত জরিমানা। অডিটে বলা হয়েছে, এতে এক ঘটনায় ২৪৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং আরেক ঘটনায় ২ কোটি ১১ লাখ টাকা লিকুইডেটেড ড্যামেজ থেকে সরকার বঞ্চিত হয়েছে। অর্থাৎ, কাজে বিলম্ব হলেও তার আর্থিক দায় ঠিকাদারের ওপর আরোপ করা হয়নি।
প্রকল্পের প্রশাসনিক ব্যয়েও মিলেছে অসঙ্গতির দীর্ঘ তালিকা। পৃথক সুপারভিশন পরামর্শক নিয়োগ থাকা সত্ত্বেও নির্মাণ তদারকির নামে অতিরিক্ত ৭০ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুসরণ না করে পরামর্শককে আপ্যায়ন ব্যয় হিসেবে ১৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। আবাসন ও রেন্টাল সুবিধার নামে আরও ৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়কে অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি বিশেষজ্ঞদের খাবার ব্যয় এবং সফটওয়্যার কেনার ক্ষেত্রেও প্রয়োজনের তুলনায় রয়েছে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ।
এছাড়া জাল বিল-ভাউচার ব্যবহার করে ৪১ লাখ ৯ হাজার টাকা সরকারি অর্থ উত্তোলনের তথ্যও উঠে এসেছে আইএমইডির প্রতিবেদনে। সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ না করে উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই পুলিশ ও ফায়ার স্টেশন নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে ২১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও সরকারি গাড়ি ফেরত না দেওয়ায় ১৪ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং পৃথকভাবে আরও ৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকার অডিট আপত্তি রয়েছে।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনায়ও অনিয়ম ধরা পড়েছে। পরামর্শকের বিল থেকে প্রয়োজনীয় আয়কর কম কাটার কারণে সরকারের ৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা রাজস্ব ক্ষতির কথা বলা হয়েছে। উপ-ঠিকাদারের বিল থেকে ভ্যাট কম কাটার কারণে আরও ২ কোটি ৮৯ লাখ টাকার ক্ষতির অভিযোগ রয়েছে। নিরাপত্তা সেবার জন্য দেওয়া ১৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকার অগ্রিম দীর্ঘদিন সমন্বয় না করাকেও আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা হিসেবে উল্লেখ করেছে অডিট কর্তৃপক্ষ।
কর্ণফুলী টানেল একটি অতি উৎসাহী ভোগবাদী প্রকল্প। প্রকল্পের কথা বলে সার্ভিস এরিয়ায় বাংলো বানিয়ে ভোগবিলাস করা হয়েছে। এখানে বসে তারা বিশ্রাম করাসহ বোয়াল মাছ খেয়েছে।—অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক
২০১৫-১৬ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত আর্থিক বিশ্লেষণ করেছে আইএমইডি। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কর্ণফুলী টানেল চালু হওয়ার পর ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে আয় শুরু হয়েছে, কিন্তু ডিসকাউন্টসহ মোট আয় মাত্র ১১৬ কোটি ৭০ লাখ টাকায় সীমাবদ্ধ রয়েছে। অন্যদিকে, ডিসকাউন্টসহ মোট খরচ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৮২৫ কোটি ৫৫ লাখ কোটি টাকা। ফলে নেট প্রেসেন্ট ভ্যালু অত্যন্ত নেতিবাচক (-৯৭০৮.৮৪ কোটি টাকা) এবং বেনিফিট-কস্ট রেশিও মাত্র ০.০১২ হয়েছে।
২ শতাংশ ডিসকাউন্ট রেটে হিসাব করা এই সূচকগুলো স্পষ্টভাবে দেখায় যে, প্রকল্পটি স্বল্প বা মধ্যম মেয়াদে বিনিয়োগ ফেরত পাবে না। টোল আদায় ও ট্রাফিক প্রবাহ অপর্যাপ্ত থাকায় আয়বৃদ্ধি শ্লথগতির। সামগ্রিকভাবে, প্রকল্পের অর্থনৈতিক টেকসইতা নিশ্চিত করতে ট্রাফিক বাড়ানো, টোল রেট যৌক্তিক করা এবং অপারেশনাল খরচ কমানোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এছাড়া জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক বিশেষত, শাহ আমানত সেতুতে ওভারলোড ট্রাক, লরি ও অন্যান্য যানবাহনের চলাচল নিষিদ্ধের লক্ষ্যে এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশন স্থাপন করা যেতে পারে বলে মত দিয়েছে আইএমইডি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পটি অতি উৎসাহীভাবে তৈরি করা হয়েছে। সাময়িকভাবে জনগণের জমি নিয়ে অবৈধভাবে স্থায়ী বিলাসী অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল হক বলেন, কর্ণফুলী টানেল একটি অতি উৎসাহী ভোগবাদী প্রকল্প। প্রকল্পের কথা বলে সার্ভিস এরিয়ায় বাংলো বানিয়ে ভোগবিলাস করা হয়েছে। এখানে বসে তারা বিশ্রাম করাসহ বোয়াল মাছ খেয়েছে।
‘জনগণের জমিতে ৩৬টি বাংলো অবৈধ। সার্ভিস এরিয়ায় ফাইভ স্টার হোটেল কেন নির্মাণ হলো। বাংলাদেশের সংবিধানে আছে, জনগণের জমি সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। অথচ সার্ভিস এরিয়ার নামে আজীবনের জন্য জনগণের জমি নেওয়া হলো।’
অধ্যাপক ড. এম শামসুল হকের ভাষ্য, প্রকল্প এলাকায় বাংলো কেন? এ ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে। পরিকল্পনা কমিশনকে ধরতে হবে। প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়নি। তাহলে কী প্রাক্কলন হলো? যারা প্রাক্কলন করেছেন তাদের ধরতে হবে। সে হিসেবে বলবো এটি একটি দেউলিয়া প্রকল্প। সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি করতে হবে।

















