বিশ্বমঞ্চে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জয়জয়কার: অনন্য আবিষ্কারে তাক লাগালেন চবির ৭ বিজ্ঞানী!

22

মুশফিকুর আবরার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে : আন্তর্জাতিক গবেষণার বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ে এবং অনন্য সব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ৭ জন কৃতী বিজ্ঞানী।

Advertisement

ক্যানসার প্রতিরোধ, পরিবেশ সুরক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতো জটিল সব ক্ষেত্রে তাদের যুগান্তকারী গবেষণা বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় ও সংস্থায় রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশে ভেসব বিদ্যার (Pharmacognosy) পথিকৃৎ উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ. এন. এম. আলমগীর (বৈশ্বিক র‍্যাংক ৬০,৬২৪) দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে ঔষধি গাছ নিয়ে কাজ করছেন। তিনি ২৩টি ক্যানসার প্রতিরোধী গাছের মধ্যে বিশেষ অ্যালকালয়েড, ফ্ল্যাভোনয়েড এবং স্যাপোনিনের উপস্থিতি প্রমাণ করেছেন। তার লেখা দুই খণ্ডের বই ‘Therapeutic Use of Medicinal Plants and their Extracts’ বিশ্বজুড়ে ১০,০০০ বারের বেশি সাইটেশন পেয়েছে এবং এটি বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) হার্বাল গাইডলাইনের অন্যতম রেফারেন্স। এছাড়া লবণাক্ততায় ধানের ATPase এনজাইমের কার্যকারিতা নিয়ে তার গবেষণা দেশের লবণসহিষ্ণু ধান উদ্ভাবনে বড় ভূমিকা রাখছে।

মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. খান তৌহিদ ওসমান (বৈশ্বিক র‍্যাংক ৯৬,০৬৫) পরিবেশ ও মৃত্তিকা গবেষণায় আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত। তার লেখা ৪টি বই বিখ্যাত ‘Springer’ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে, যা বর্তমানে বিশ্বখ্যাত এমআইটি (MIT) এবং কর্নেল ইউনিভার্সিটির মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানো হয়। তিনি প্রথম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাহাড়ি বনভূমির মাটির ‘Morphology’ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র তৈরি করেন। তার গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ভার্মিকম্পোস্ট ও ঝিনুকের খোলস থেকে তৈরি ‘Hydroxyapatite’ দিয়ে মাটির ক্ষতিকর সিসা ৮০% পর্যন্ত নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব। চট্টগ্রামের শিল্প এলাকার মাটিতে ভারী ধাতু দূষণের প্রথম ডেটাবেজটিও তার হাত ধরেই তৈরি।

রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. এস. এম. আবে কাউছার (বৈশ্বিক র‍্যাংক ১৫৪,৪০৮ এবং H-index ৩৫+) ১৫০টিরও বেশি নতুন সুগার-ভিত্তিক অর্গানিক যৌগ তৈরি করেছেন। তিনি ইউরিডিন এর ‘acylated derivative’ সংশ্লেষণ করেছেন, যা অত্যন্ত শক্তিশালী অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল হিসেবে কাজ করে।পরিবেশবান্ধব ‘Green Chemistry’ পদ্ধতিতে কোনো ক্ষতিকর দ্রাবক ছাড়াই ওষুধের কাঁচামাল তৈরির অভিনব পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন এই বিজ্ঞানী।

একই বিভাগের রসায়ন বিজ্ঞানের প্রভাষক ইমরানুল কবির (বৈশ্বিক র‍্যাংক ২০৫,০৬৫) এই তালিকার সবচেয়ে তরুণ গবেষক। তিনি অধ্যাপক ড. আবে কাউছারের সাথে যৌথভাবে ‘Fabric Phase Sorptive Extraction (FPSE)’ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছেন। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে রক্ত, দুধ বা পানিতে প্যারাবেন কিংবা বিসফেনল এ-এর মতো মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক অত্যন্ত কম খরচে শনাক্ত করা যায়। তার উদ্ভাবিত এই পদ্ধতিটি বর্তমানে ইউরোপের খাদ্য নিরাপত্তা ল্যাবরেটরিগুলোতে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চর্চার অন্যতম পথিকৃৎ সিএসই (CSE) বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন (বৈশ্বিক র‍্যাংক ২০৮,১৭৯) যুক্তরাজ্যের UMIST থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। তিনি তৈরি করেছেন ‘Belief Rule-Based Expert System’, যা চরম Uncertainty বা অনিশ্চয়তার মধ্যেও নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই সিস্টেমের মাধ্যমে তিনি ৯২% নির্ভুলতায় হৃদরোগের পূর্বাভাস, সাইবার আক্রমণ শনাক্তকরণ এবং ধানের ব্লাস্ট রোগ চেনার অ্যাপ তৈরি করেছেন। তার লিখিত ‘Computing Reality’ বইটি বিখ্যাত ACM Digital Library-তে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

মেরিন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. এস. এম. শরিফুজ্জামান (বৈশ্বিক র‍্যাংক ৩১৩,৬২৯) বঙ্গোপসাগরের জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণায় দেশের শীর্ষস্থানীয় নাম। ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সেন্টমার্টিনে ১৮টি নতুন প্রজাতির মাছ আবিষ্কার করেছেন তিনি, যার মধ্যে উড়ুক্কু মাছ ‘Cheilopogon spilonotopterus’ বাংলাদেশে প্রথম রেকর্ড। বিশ্বখ্যাত ‘Science of the Total Environment’ জার্নালে প্রকাশিত তার গবেষণায় উঠে এসেছে যে, লইট্যা ও চিংড়ির পেটে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমছে, যা খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ঢুকছে। জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে ক্যাডমিয়াম ও আর্সেনিক কীভাবে সমুদ্রে ছড়ায়, তার প্রথম মানচিত্রও তিনিই তৈরি করেন।

জাপান থেকে পিএইচডি এবং সাউথ আফ্রিকা থেকে পোস্টডক করা বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আতিয়ার রহমান (বৈশ্বিক র‍্যাংক ৩৬৭,৫২৫) দেশীয় কাঁটাকচু, তেঁতুল ও হাতিকানা গাছ থেকে ডায়াবেটিস ও লিভার টক্সিসিটি কমানোর কার্যকর যৌগ আবিষ্কার করেছেন। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, তেঁতুলের বায়োমেটাবোলাইট ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত ডক্সোরুবিসিন ওষুধের কারণে হওয়া হার্টের ক্ষতি কমিয়ে দেয়। এছাড়া করোনা-পরবর্তী জটিলতা দূর করতে ‘Functional Food’ বা কার্যকরী খাদ্য কীভাবে কাজ করে, তা নিয়ে তার ৭৩টি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র রয়েছে।

বিশ্বের বুকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তথা বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করা এই ৭ বিজ্ঞানীর এমন অভূতপূর্ব সাফল্য দেশের বিজ্ঞান চর্চায় তরুণ প্রজন্মকে আরও অনুপ্রাণিত করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

Advertisement