মুশফিকুর আবরার রাফি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে : ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠার সময় দেশের সর্ববৃহৎ ও অন্যতম শীর্ষায়িত বিদ্যাপীঠ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে (চবি) একটি সম্পূর্ণ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার সুদূরপ্রসারী মাস্টারপ্ল্যান বা মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। ২১শ একরের এই বিশাল পাহাড়ি ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের শতভাগ আবাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি তৎকালীন আধুনিক প্রকৌশল বিদ্যার ওপর ভিত্তি করে একটি কার্যকর ও ১০০ ভাগ পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার নকশাও চূড়ান্ত করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল একটি সুশৃঙ্খল, পরিবেশবান্ধব এবং জলাবদ্ধতামুক্ত আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাঙ্গন তৈরি করা। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, গৌরবময় প্রতিষ্ঠার ৬০ বছর পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত সেই ঐতিহাসিক ও দূরদর্শী মহাপরিকল্পনার সিংহভাগই শুধু কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে, যার বাস্তব কোনো প্রতিফলন ক্যাম্পাসবাসী দেখতে পায়নি।
ছয় দশক ধরে চবি প্রশাসন শিক্ষার্থীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ আবাসন নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে বাধ্য হয়ে ক্যাম্পাস সংলগ্ন মেস কিংবা শহর থেকে লোকাল ট্রেনে চড়ে তীব্র ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় ও দৃশ্যমান সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের চরম বিপর্যস্ত ও অচল ড্রেনেজ ব্যবস্থা। সামান্য কিংবা মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাতেও পুরো ক্যাম্পাস যেন এক অবর্ণনীয় ভোগান্তির জায়গায় পরিণত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান যাতায়াতকারী সড়ক, বিভিন্ন অনুষদের সম্মুখভাগ এবং হলের চারপাশ নিমেষেই কর্দমাক্ত ও নোংরা পানি জমে থাকে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক ও বিস্ময়কর বিষয় হলো, আকাশে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাওয়ার দীর্ঘ সময় পরেও রাস্তা থেকে এই জমে থাকা পানি সরার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। মূল নকশাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ড্রেনগুলো যুগের পর যুগ ময়লা-আবর্জনা ও পাহাড় থেকে নেমে আসা পলিমাটিতে ভরাট হয়ে থাকায় পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে গেছে।
ক্যাম্পাসের এই বর্তমান করুণ দশার মূল কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আঙুল সরাসরি প্রশাসনের অপরিকল্পিত ও দূরদর্শিতাহীন তথাকথিত উন্নয়ন অবকাঠামোর দিকে। বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন সময়ে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন নতুন অ্যাকাডেমিক ভবন, হল কিংবা রাস্তাঘাট নির্মাণ করা হলেও সেগুলোর সাথে কোনো সমন্বিত বা টেকসই ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক রাখা হয়নি। মাস্টারপ্ল্যান না মেনে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও ব্যক্তিস্বার্থের তাগিদে যেখানে-সেখানে অবকাঠামো নির্মাণের ফলে প্রাকৃতিকভাবে পানি নেমে যাওয়ার প্রাকৃতিক ছড়া ও জলাশয়গুলো ভরাট করে ফেলা হয়েছে। ফলে প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমে সংস্কার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নামে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও জলাবদ্ধতা সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান মেলেনি। এই সমন্বয়হীন ও জোড়াতালির উন্নয়নকে অর্থহীন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের চরম অপচয় হিসেবে দেখছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষক সমাজ ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। প্রশাসনের এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের কারণে বছরের পর বছর ধরে জনগণের ট্যাক্সের কোটি কোটি টাকা জলে যাচ্ছে।
এই চরম অব্যবস্থাপনার সরাসরি চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের, যার ফলে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ। এই জমে থাকা নোংরা পানির ফলে নানাবিধ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন হাজারো শিক্ষার্থী, যা তাদের মানসিক ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। একটি স্বায়ত্তশাসিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেখানে গবেষণার সুষ্ঠু পরিবেশ থাকার কথা, সেখানে সামান্য বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে পানি জমে থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অচলাবস্থা দূর করতে হলে অনতিবিলম্বে ১৯৬৬ সালের মূল মাস্টারপ্ল্যানকে আধুনিকায়ন করে একটি সমন্বিত, টেকসই ও দূরদর্শী মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। তা না হলে কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় অপচয় যেমন বন্ধ হবে না, তেমনই দেশের অন্যতম প্রধান এই বিদ্যাপীঠের শিক্ষার পরিবেশ অচিরেই ধূলিসাৎ হয়ে পড়বে।

















