চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেছেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও অন্যতম শক্তি। সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এই ঐতিহ্য কোনো অশুভ শক্তিকে নষ্ট করতে দেওয়া হবে না। আগামী প্রজন্মের জন্য এ সম্প্রীতি অটুট রাখতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
আজ ১৬ অক্টোবর শুক্রবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম জেলার রাউজান পৌর সদরের শ্রীশী জগন্নাথ সেবাশ্রমে ঢেউয়া পাড়া উদয়াচল সংসদ আয়োজিত শ্রীশ্রী শারদীয় দুর্গাপূজার মহাষষ্ঠীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন হাটহাজারীর মিরেরহাট এলাকার চন্দ্রপুরের ওঁকার জ্যোতি মঠের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ শ্রীমৎ স্বামী তাপসানন্দ গিরি মহারাজ।
পূজা কমিটির সভাপতি বিমল কান্তি শীলের সভাপতিত্বে ও প্রদীপ কুমার শীলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোঃ শরীফ উদ্দিন, রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম রাহাতুল ইসলাম ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক অংছিং মারমা, জেলা আনসার কমান্ড্যান্ট সেফাউল হোসেন, শ্রীশ্রী জগন্নাথ সেবাশ্রমের সাধারণ সম্পাদক টিটু কান্তি দে প্রমূখ। বিভিন্ন পূজা উদযাপন পরিষদের কর্মকর্তা ও সদস্যবৃন্দসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা এসময় উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে তিনি উপজেলার ডাবুয়া ও হলদিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন পূজামন্ডপ পরিদর্শন এবং সেখানে অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে আর্থিক সহায়তা তুলে দেন। এছাড়া মহাষষ্ঠী পূজার রাতে (শুক্রবার) নগরীর জেএমসেন হলে মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদ আয়োজিত কেন্দ্রীয় পূজামন্ডপ পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক
এবারের দুর্গাপূজায় মানুষের উৎসাহ ও অংশগ্রহণ বেড়েছে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, সারা দেশে প্রায় ১ হাজার ৫’শটি এবং চট্টগ্রামে প্রায় ৪’শটি নতুন সর্বজনীন পূজামন্ডপ হয়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে মন্ডপগুলোতে সরকারি সহায়তাও বাড়ানো হয়েছে।
ডিসি জাহিদ বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য এক দিনে গড়ে ওঠেনি। শত শত বছর ধরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে এ ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে। ‘উৎসব কখনো একা করা যায় না, উৎসব হয় সবার’—এ কথা উল্লেখ করে তিনি সবাইকে নিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা উদ্যাপনের আহ্বান জানান।
দুর্গাপূজার নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণে রাউজানের বিভিন্ন এলাকায় যান জেলা প্রশাসক। এ সময় আনসার, এসআরবি ও ব্যাটালিয়ন আনসার সদস্যদের অংশগ্রহণে যৌথ নিরাপত্তা মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। তিনি হলদিয়া ইউনিয়নের পাহাড়ঘেরা এলাকায় অবস্থিত জানিপাথর সর্বজনীন দুর্গামন্দিরসহ কয়েকটি পূজামন্ডপ পরিদর্শন করেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো জানিপাথর মন্দিরে এর আগে কোনো জেলা প্রশাসক যাননি।
পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক রামদয়াল মাঝির বাড়ি দুর্গামন্দির, ডাবুয়া কাকলী সংঘ ও ঢেউয়াপাড়ার জগন্নাথ সেবাশ্রম দুর্গামন্দির পরিদর্শন করেন। এ সময় দুটি পূজামন্ডপে আর্থিক সহায়তা দেন। এ ছাড়া সম্প্রতি অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত তিনটি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে তাদেরও আর্থিক সহায়তা দেন তিনি।
হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে অগ্নিসংযোগের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, গত বুধবার রাতে দুটি বাড়িতে দুর্বৃত্তরা আগুন দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে ধর্মীয় বা গোষ্ঠীগত কোনো বিরোধের তথ্য পাওয়া যায়নি। কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা করে থাকতে পারে।
তিনি জানান, সম্প্রতি সোমবার ও বুধবারের অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মামলা হয়েছে। জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে। দ্রুত তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম আরও জানান, আগামী ২০ অক্টোবর চট্টগ্রামেমের ঐতিহ্যবাহী জেএমসেন হলের পূজামন্ডপ পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসার কর্মসূচি রয়েছে। এ উপলক্ষে প্রস্তুুতি নেওয়া হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক জাহিদ জানান, চট্টগ্রামে এবার ২ হাজার ৫৯৩টি পূজামন্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নিরাপত্তায় প্রায় সাড়ে ১২ হাজার আনসার সদস্য ও পাঁচ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি র্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দায়িত্ব পালন করছে। প্রতিটি পূজামন্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং স্বেচ্ছাসেবকদের পালাক্রমে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তাসংক্রান্ত সমস্যা দ্রুত জানাতে পূজা উদ্যাপন কমিটিগুলোর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপও খোলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা আনসার ও ভিডিপির কমান্ড্যান্ট মোঃ সেফাউল হোসেন বলেন, দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আনসার সদস্যরা সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকবেন।

















