সীমাবদ্ধতা’র হেলমেটে মোড়ানো বিপিএল

290

অঘোর মন্ডলঃ স্বপ্ন-আশা-বাস্তবতা। এই তিনের যোগফলে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগ-বিপিএল কোথায় দাঁড়িয়েছে যাত্রা শুরুর এক দশক পরে। ছোট্ট একটা বাক্যে এর উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তার পরও দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা উত্তর খুঁজে বেড়ান। তবে উত্তরটা পাটীগণিতের সরল অঙ্কের মতো মেলানো সম্ভব নয়। কারণ বিপিএলের সঙ্গে অনেক কিছু জড়িয়ে। অর্থনীতি-রাজনীতি-কূটনীতি-সংস্কৃতির মিশেলে ক্রিটেক নামক এই বিনোদন প্যাকেজ! শুধু বিনোদন প্যাকেজ বলা ঠিক হবে না। বরং বলা ভালো বিনোদনের বাণিজ্যিক প্যাকেজ।

Advertisement

এক দশকেরও বেশি সময় আগে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ-আইপিএলের আদলে একটা লিগ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন সে সময়ের বিসিবি সভাপতি আ হ ম মুস্তফা কামাল। আইপিএলকে মডেল করে সেই স্বপ্নযাত্র শুরু। সেই স্বপ্নের ডালপালাও মেলেছিল। বেশ ভালোভাবেই নাড়া দিয়েছিল দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে। বিপিএল দেখে বাংলাদেশ ক্রিকেটের আর্থিক সামর্থ্য নিয়ে সংশয় দূর হতে থাকে ক্রিকেটবিশ্বের। বরং পুরনো ধারণাটা নতুন করে ভাবাতে শুরু করে ক্রিকেটমহলকে। বিশ^ ক্রিকেটের নতুন এক বড় বাজার বাংলাদেশ। তার প্রমাণ ছিল মাঠে দর্শক উপস্থিতি। ফ্রাঞ্চাইজিগুলোর স্পন্সরশিপ। লিগের টেলিভিশন সম্প্রচার স্বত্ব মূল্য। বিদেশি নামিদামি বড় বড় তারকা ক্রিকেটারের পারফরম্যান্স। খুব সংক্ষেপে এই ছিল বিপিএলের স্বপ্ন পূরণের গল্প।

সেই গল্পের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের দুর্বল দিকগুলোও ফুটে বেরিয়েছিল। ইতিবাচক অর্থে বলা যায়, দুর্বল দিকগুলোকে চিহ্নিত করা গিয়েছিল। যেমন ভেন্যু সমস্যা। হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে পদ্ধতিতে ম্যাচ আয়োজনে সমস্যা। এক মৌসুম, দুই মৌসুম, তিন মৌসুম পর একটু একটু করে হলেও সেই সমস্যার সমাধান হবে। খেলাটা সারাদেশের মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া যাবে।

তরুণ প্রজন্মকে ক্রিকেটের দিকে আরও বেশি টেনে আনা যাবে। প্রান্তিক জনপদ থেকে উঠে আসবেন আরও তরুণ ক্রিকেটার। যারা বিদেশি ক্রিকেটার-কোচদের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করে জাতীয় দলকে সমৃদ্ধ করতে পারবেন। সে রকম আভাসও ছিল। আশান্বিত হওয়ার মতো অনেক কিছুই ছিল। কিন্তু আশার উল্টো পিঠেই আছে হতাশা। সেই হতাশার ধূসর চেহারাটাও বেরিয়ে আসতে শুরু করে এক একটা মৌসুম শেষে। বিপিএল সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায় ম্যাচ ফিক্সিং ইস্যুতে। মোহাম্মদ আশরাফুল নিজের মুখেই যখন ম্যাচ ফিক্সিং ইস্যুতে স্বীকারোক্তি দেন তখন সাধারণ মানুষের কাছে বিপিএল বিশ্বাস যোগ্যতা হারায় খেলা হিসেবে! ম্যাচের স্বাভাবিক হার-জিতের ওপরও কেন জানি সন্দেহ-সংশয়ের একটা কালো ছায়া খুঁজে বেড়ান তারা! ফ্রাঞ্চাইজিশাসিত এই লিগে ফ্রাঞ্চাইজির সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিদের সামাজিক ইমেজও যখন প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করল তখন রঙ হারায় বিপিএল। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ যখন বিবর্ণ হতে শুরু করে তখন ক্রিকেটবিশে^ আরও অনেক দেশে শুরু হয় ফ্রাঞ্চাইজি লিগ। চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় বিপিএল। সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ আর্থিক দিক থেকে। এ ধরনের লিগে ক্রিকেটারদের সামনে থাকে ডলারের হাতছানি। যেখানে ডলার বেশি সেখানে ছুটে যান ক্রিকেট ফেরিওয়ালারা। মানে তারকা ক্রিকেটাররা। যে কারণে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে এখন অনেক বিদেশি ক্রিকেটার খেলছেন, তাদের অনেকের পরিচয় খুঁজতে সার্চ দিতে হয় গুগলে! তারা রান করছেন। সেঞ্চুরি করছেন। উইকেট নিচ্ছেন। ম্যাচ জেতাচ্ছেন! কিন্তু দর্শকহৃদয় জেতাতে পারছেন না! লিগের ব্র্যান্ডভেল্যু কমছে।

বর্তমান সময়ে সেই চ্যালেঞ্জটা একটু বেড়েছে। তার কারণ অর্থনৈতিক। করোনা-পরবর্তী বিশ্বে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ পরিস্থিতির ধাক্কাটা বৈশ্বিক। যার ঢেউ বাংলাদেশেও লেগেছে। মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে। ডলার সংকট দেখা দিয়েছে। সে ক্ষেত্রে বিদেশি ক্রিকেটারদের পেমেন্ট কীভাবে দেওয়া হবে অনেকগুলো প্রশ্ন সামনে চলে আসে। সেসব প্রশ্ন ধাক্কা দেয় বিপিএল নিয়ে আশাগুলোকে এবং এটাই বাস্তবতা। কিন্তু ফ্রাঞ্চাইজিগুলো যদি লম্বা সময়ের জন্য বিসিবির সঙ্গে চুক্তিতে থাকত দেশ ক্রিকেটের উন্নয়নে নিজেদের ভূমিকা কী হবে সে বিষয়ে লিখিত স্বচ্ছ ধারণা পেশ করে, তা হলে হয়তো বিসিবি সরকারের কাছেও অন্যরকম কোনো প্রস্তাবনা পেশ করতে পারত। কিন্তু জার্সি বদলের মতো প্রায় প্রতিবছর ফ্রাঞ্চাইজির মালিকানা বদল হচ্ছে। নাম বদল হচ্ছে, তখন বাড়তি সুবিধা সরকার কাকে দেবে? কেন দেবে? দেশের ক্রিকেটের মান উন্নয়নে তারা কী অবদান রাখছেন, কী করতে চান, তা তো খোদ বিসিবিও হয়তো জানে না! আবার গণমাধ্যম থেকে এসব প্রশ্ন উঠলে সেটাকে বিসিবি খুব সহজভাবে নিতে পারে না! পেশাদার লিগ পরিচালনায় আরও পেশাদার মানসিকতার পরিচয় দেওয়া দরকার। সেখানে খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেওয়া নিজেদের অদক্ষতা আড়ালের চেষ্টা বেরিয়ে পড়ে। সব প্রশ্নের উত্তর ‘আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে। বুঝতে হবে।’এটা হতে পারে না। ২০১২ সালে যে সীমাবদ্ধতা সেটা যদি ২০২৩-এ আরও প্রকট হয়ে ওঠে তখন পরিষ্কার হয়ে যায় সদিচ্ছা, দক্ষতা এবং চেষ্টায় ঘাটতি আছে!

টেস্ট প্লেয়িং দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ক্রিকেটে এখনো ভেন্যু বড় এক সমস্যার নাম। কিন্তু আর কতদিন এই সমস্যার বোঝা কাঁধে নিয়ে ঘুরবে বাংলাদেশ ক্রিকেট? অর্থ সংকটে এই সমস্যা? বিশ্বাসযোগ্য নয়। একই সঙ্গে অগ্রহণযোগ্য। ঢাকার পাশে বিশ মিনিটের দূরত্বে ফতুল্লা স্টেডিয়াম। যেখানে অস্ট্রেলিয়ার মতো নাক উঁচুু দল টেস্ট খেলেছে। ভারত খেলেছে। সেটা খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। বড়জোর বছর সাতেক হবে। তা হলে সেই স্টেডিয়াম কেন আজ ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে থাকবে? বিসিবির উত্তরটা নিশ্চয়ই খুব সহজ। ওটা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ-এনএসসির মাঠ। আমরা কী করতে পারি? এটা হচ্ছে দায় এড়িয়ে যাওয়ার জন্য খুব ভালো উত্তর। কিন্তু ক্রিকেটের প্রতি যদি দায়বদ্ধতা থাকে তা হলে আপনার এই উত্তর ধোপে ঠিকবে না। কারণ বিসিবির কাজ হচ্ছে খেলাটা সারাদেশে সুন্দরভাবে পরিচালনা। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সঙ্গে বিসিবির সম্পর্ক নিশ্চয়ই দা-কুমড়া নয়। তাদের সঙ্গে আলাপ করার জন্য জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের মনোনীত দুজন পরিচালকও আছেন বিসিবিতে। তাদের কি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কখনো। বলা হয়েছে, আমাদের গ্রাউন্ডস কমিটি পারছে না, আপনারা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের চেয়ারম্যান তথা ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে মাঠ সংস্কারের কাজটা দ্রুত করার ব্যবস্থা করুন। তারা না পারলে বিসিবি সভাপতি নিজেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে পুরো বিষয়টা তুলে ধরতে পারতেন। যে দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজের দাপ্তরিক কাজের ফাঁকে ফাঁকে মাঠের খেলার খবর নেন টেলিফোনে, তিনি নিশ্চয়ই ফতুল্লা স্টেডিয়ামের এই দুরবস্থা দূর করার দ্রুত নির্দেশনা দিতেন। হয়তো বলা হবে, আমলাতান্ত্রিক কিছু জটিলতার কারণে মাঠ সংস্কারের কাজ দেরি হচ্ছে! কিন্তু কতদিন? আর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে কটা চিঠি দেওয়া হয়েছে? স্থানীয় সংসদ সদস্যকেই বা কবার বলা হয়েছে মাঠ সংস্কার করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নারায়ণগঞ্জে ফেরানো মানে সরকারের ইমেজ বাড়ানো। প্রধানমন্ত্রীর কান পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে বিষয়টা। নিশ্চিত বলা যায়, এসব বিষয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্রিকেটসংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হলে এভাবে ঝুলে থাকত না। শুধু নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কথা কেন বলছি, প্রধানমন্ত্রীর চাচার নামে খুলনায় যে ক্রিকেট স্টেডিয়াম সেটা ভুতুড়ে বাড়ির মতো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে! অথচ এই শেখ আবু নাসের ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ টেস্ট খেলেছে পাকিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। দেশের ইতিহাসে প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচের জয়ও এসেছিল এই মাঠে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। অথচ সেখানে এখন ক্রিকেট হয় না! সপ্তাহদুয়েক আগে প্রধানমন্ত্রী নিজে খুলনা ঘুরে এসেছেন। এই স্টেডিয়াম থেকে কয়েক মিনিটের দূরত্বে নিজের পৈতৃক বাংলোতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাকে কী বলা হয়েছে, খুলনায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট করা যাচ্ছে না। স্টেডিয়ামটার জরুরি সংস্কার দরকার!

বাংলাদেশকে ক্রিকেটের মধ্য দিয়ে ব্র্যান্ডিং করার সবচেয়ে ভালো জায়গা কক্সবাজার। সেটা সবার আগে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যিনি তার নাম শেখ হাসিনা। ২০০০ সালেই তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন কক্সবাজারে ক্রিকেট স্টেডিয়াম করার। জমি অধিগ্রহণ হলো। মাঠ হলো। প্রধানমন্ত্রীর ভাই, ক্রিকেটার, ক্রীড়া সংগঠক শহীদ শেখ কামালের নামে নামকরণ করে একটা স্টেডিয়াম করা হলো! যেখানে আসলে কোনো আন্তর্জাতিক মানের টুর্নামেন্ট করা হয়নি! কোনো টেস্ট বা ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি আয়োজন করা হয়নি। কারণ ওটা শুধু নামে আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম। যে দেশের প্রধানমন্ত্রী বিশ^ব্যাংককে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতুর মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করার শুধু দুঃসাহস দেখাননি। বাস্তবায়ন করে গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছেন, সেই দেশে সবচেয়ে ভালো ক্রিকেট স্টেডিয়াম হতে পারত যেটা সেই কক্সবাজারে শেখ কামালের নামে করা স্টেডিয়াম প্রায় মুখ থুবড়ে পড়া অবস্থায় অর্থের অভাবে? কেউ বিশ্বাস করবেন না। কারণ বিসিবির কর্তারা নিজেরাই বলেন, তাদের ব্যাংক ব্যালান্স অনেক মোটা। তা হলে ওই ৯শ কোটি বা হাজার কোটি টাকা ব্যাংকে রেখে লাভ কী! আর বিপিএল এলে আমাদের শুনতে হবে, হোম অ্যান্ড অ্যাওয়েতে ম্যাচ করা সম্ভব নয়। মাঠ সমস্যা। হোটেল সমস্যা। বিমানবন্দর সমস্যা! বাস্তবতা যা বলে, তাতে ওই কথাগুলো বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না!

স্বপ্ন-আশা-বাস্তবতা। এই তিন স্টাম্পের ওপর বিপিএলের বেল নেই। কোনো একটা স্টাম্প নড়ে যাওয়ায় বেল পড়ে গেছে! কিন্তু বলটা কোন দিক থেকে কে করছেন, কোন স্টাম্পটা নড়ে গেছে সেটাই দেখা যায় না! জানতে চাইলে বলা হবে সীমাবদ্ধতা আছে! যেমন সীমাবদ্ধতা তাদের ডিআরএস নিয়ে! ‘সীমাবদ্ধতা’ এই শব্দটা যদি হয় বিপিএলের মান রক্ষার একমাত্র হেলমেট, সেখানে লিগটা রঙ হারাবে এটাই স্বাভাবিক।

Advertisement