অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রেখে মানবিক রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়: ডিসি জাহিদ

27

সমাজের কোনো জনগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রেখে একটি মানবিক ও উন্নত রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেন, মানুষ কোথায় জন্ম নেবে, তা তার নিয়ন্ত্রণে নয়; তবে পরিশ্রম, দক্ষতা ও বড় স্বপ্নের মাধ্যমে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব। সরকারের দেওয়া আর্থিক সহায়তা ভোগে নয়, উৎপাদনমুখী কাজে ব্যবহার করতে হবে, কারণ এ অর্থ জনগণের কষ্টার্জিত করের টাকা।

Advertisement

রোববার (২৮ জুন) চট্টগ্রাম জেলা সমাজসেবা কার্যালয় আয়োজিত ‘অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন’ শীর্ষক ১৫ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণের সমাপনী, সনদ ও আর্থিক অনুদান বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক।

জেলা প্রশাসক বলেন, বাংলাদেশ একটি বৈচিত্র্যময় দেশ। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষ যুগ যুগ ধরে সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করলেও অনেকেই এখনো উন্নয়নের মূলধারা থেকে পিছিয়ে রয়েছে। তাঁদের জীবনমান উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রশিক্ষণ কোনো সমাপ্তি নয়; এটি নতুন পথচলার শুরু। বিশ্ববাজারের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিয়মিত দক্ষতা বাড়াতে হবে। ‘আপনি যদি স্থির থাকেন আর পৃথিবী এগিয়ে যায়, তাহলে পৃথিবীর সঙ্গে আপনার দূরত্বই বাড়বে,’ বলেন তিনি।

সময়কে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, বড় স্বপ্ন দেখতে হবে এবং তা বাস্তবায়নে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। ড. বি. আর. আম্বেদকরের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, অধিকাংশ সফল মানুষ প্রতিকূলতাকে জয় করেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাই ব্যর্থতার অজুহাত না খুঁজে আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

তিনি বলেন, সরকারের প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তার প্রকৃত সফলতা তখনই আসবে, যখন প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে নিজেদের জীবনমান পরিবর্তন করতে পারবেন। সরকার শুধু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা বাড়াতে নয়, তাঁদের বাস্তব উন্নয়ন নিশ্চিত করতেই গুরুত্ব দিচ্ছে।

ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীর আবাসন ও কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, তাঁদের প্রায় ২৫০টি পরিবারের আবাসনের দাবি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।

সরকারি অনুদানের বিষয়ে তিনি বলেন, অনুষ্ঠানে প্রায় ৯২ লাখ ৬০ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা বিতরণ করা হচ্ছে। এই অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা সবার নৈতিক দায়িত্ব। উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ করা হলে ব্যক্তি যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি সরকারের উদ্দেশ্যও সফল হবে।

প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তব চাহিদাভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো এলাকায় কী ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়েই প্রশিক্ষণের বিষয় নির্ধারণ করা উচিত। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দক্ষতার ধারাবাহিক উন্নয়ন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

নৈতিক অবক্ষয়ের প্রসঙ্গ তুলে জেলা প্রশাসক বলেন, অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ না ঘটলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। সমাজে নৈতিকতা, মানবিকতা ও বিবেক জাগ্রত করতে সামাজিক সংগঠনগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।

তিনি মাদকের ভয়াবহতার কথা উল্লেখ করে বলেন, মাদক মানুষের বিবেক ও বিচারবোধ নষ্ট করে দেয়। তাই একটি মাদকমুক্ত, নৈতিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে সরকার ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

অনুষ্ঠানে ১৫ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ সম্পন্নকারী জেলে, হিজড়া, সন্ন্যাসী, হরিজন ও সেবক সম্প্রদায়ের ২৫ জনকে জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা করে মোট ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকার অনুদান ও সনদ দেওয়া হয়। এছাড়া ২০৫টি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মধ্যে ৬৬ লাখ ৬০ হাজার টাকার অনুদান এবং প্রতিবন্ধী, দুস্থ ও মেধাবী ১৩৫ শিক্ষার্থীকে মোট ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানে ৯২ লাখ ৬০ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা বিতরণ করা হয়।

Advertisement