চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ‘স্বেচ্ছাশ্রমে’ ডলু খাল খননের নামে কোটি কোটি টাকার বালু ও মাটি লুটের আয়োজন করছে একটি প্রভাবশালী চক্র। সাতকানিয়ার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ডলু খালের গারাঙ্গিয়া ব্রিজসংলগ্ন এলাকা থেকে উত্তরের নলুয়া-আমিলাইশ তিন খালের মুখ পর্যন্ত প্রায় ২৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিভিন্ন পয়েন্টে এই বালু ও মাটি লুটের আয়োজন চলছে।
এদিকে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খননের কাজ পাওয়ার আড়ালেও রয়েছে কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ। সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মাহমুদুল হাসানের দিকেই উঠেছে এই অভিযোগের তির। বদলি আদেশ হওয়ার চার দিন পর গত ২৭ আগস্ট এক কলমের খোঁচায় একটি প্রতিষ্ঠানকে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খননের কার্যাদেশ দেন তিনি। এই এক কার্যাদেশেই সরকারের যেমন রাজস্ব বঞ্চিত হওয়ার ষোলোকলা পূর্ণ হয়েছে, তেমনি প্রভাবশালী চক্র যেন পেয়ে গেছে পুরো ডলু খালের ‘মালিকানা’। ওই প্রতিষ্ঠান এবার নিজেরাই লাখ লাখ টাকায় সেই খালের বালুমহাল ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এতে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর মধ্যে চলছে উত্তেজনা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাতকানিয়ার ইউএনও খোন্দকার মাহমুদুল হাসানকে গত ২৩ আগস্ট বদলি করে ঢাকা বিভাগে ন্যস্ত করা হয়। বদলির আদেশ হওয়ার চারদিন পর ২৭ আগস্ট তিনি ডলু খালের বিশাল এলাকা স্বেচ্ছাশ্রমে খননের জন্য ‘মেসার্স করিম অ্যান্ড ব্রাদার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেন। ওই প্রতিষ্ঠানের নামে কার্যাদেশ দিলেও এর পেছনে রয়েছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।
ইউএনও খোন্দকার মাহমুদুল হাসান স্বাক্ষরিত কার্যাদেশে বলা হয়-সাতকানিয়া উপজেলাধীন ডলু খালের গারাঙ্গিয়া ব্রিজসংলগ্ন এলাকা থেকে উত্তরে ভাটির দিকে নলুয়া আমিলাইশ তিন খালের মুখ পর্যন্ত জেগে ওঠা মাটির ঢিবি-বালুর ঢিবি খননের সম্ভাব্যতা যাচাইপূর্বক সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য চলতি বছরের ১৪ জুন গঠিত ‘স্বেচ্ছায় উপজেলা খাল খনন কমিটি’কে দায়িত্ব দেওয়া হয়। উক্ত কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করে। জেগে ওঠা মাটির ঢিবি-বালুর ঢিবি টোটাল স্টেশন মেশিন থেকে প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে অপসারণযোগ্য মাটির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। উল্লেখিত অংশের অপসারণযোগ্য মাটির পরিমাণ ১ কোটি ৮৩ লাখ ৩৮ হাজার ৩৭৩ ঘনফুট। এই প্রতিবেদন পাওয়ার পরই কোনো ধরনের টেন্ডার ছাড়াই করিম অ্যান্ড ব্রাদার্সকে বালু ও মাটি অপসারণের কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
সূত্র অভিযোগ করেছে, স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র এখন এই খালের বালু-মাটি বিক্রির নিয়ন্ত্রণ নিতে মারিয়া হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে কোথাও কোথাও মাটি বিক্রির ধুম পড়েছে। এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাসী, পাতি নেতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন নেতা দফায় দফায় মিটিং করে বালু-মাটি বিক্রি করছেন। গারাঙ্গিয়া ব্রিজ থেকে নলুয়া-আমিলাইশ পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার খালটির প্রতি আধা কিলোমিটারে বালু ও মাটির বিক্রয় মূল্য ধরা হচ্ছে ৫০ লাখ টাকা করে।
জানা গেছে, পার্বত্য জেলা বান্দরবান থেকে প্রবাহিত হয়ে ডলু নদী চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতির নারিশ্চা পানত্রিশা, পুটিবিলা, হাফেজপাড়া, আধুনগর ইউনিয়ন, লোহাগাড়া সদর ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে সাতকানিয়া উপজেলার গারাংগিয়া, সোনাকানিয়া, রূপকানিয়া, সাতকানিয়া সদর, পৌরসভা, রামপুর, পশ্চিম ঢেমশা, গাঠিয়াডেঙ্গা, নলুয়া, আমিলাইশ ইউনিয়ন হয়ে সাঙ্গু নদীতে পড়েছে। টঙ্কাবতী ও হাতিয়া খালসহ অনেক ছোট ছোট খাল ডলুর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ডলুর দৈর্ঘ্য ৫৩ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ ৪৬ মিটার।
করিম অ্যান্ড ব্রাদার্সের মালিক আবদুল করিম বলেন, আমার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খননের কার্যাদেশ পেয়েছে। আমরা কারও কাছে খালের মাটি ও বালু বিক্রি করছি না।
আটটি বৈধ বালুমহালও বিলীন : অপরিকল্পিতভাবে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খননের কার্যাদেশ দেওয়ায় ৮টির মতো বৈধ বালুর মহালের অস্তিত্ব থাকবে না। বৈধ বালু মহালের মধ্যে রয়েছে সোনাকানিয়া, রূপকানিয়া, সাতকানিয়া সদর, রামপুর, পশ্চিম ঢেমশা, রোজমর পাড়া, গাঠিয়াডেঙ্গা, নলুয়া, আমিলাইশ এলাকা। এসব বালু মহাল থেকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পেত। সরকার এসব রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হবে।
সাতকানিয়া উপজেলা প্রকৌশলী সবুজ কুমার দে বলেন, ইউএনও অফিস আমাকে সার্ভে করে একটি রিপোর্ট দিতে বলেছিল। আমি রিপোর্ট দিয়েছি। এরপর কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। খালের উল্লেখিত অংশের অপসারণযোগ্য মাটির পরিমাণ ১ কোটি ৮৩ লাখ ৩৮ হাজার ৩৭৩ ঘনফুট পেয়েছি। এলাকাবাসী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এভাবে নির্বিচারে বা অপরিকল্পিকভাবে খাল খনন করা হলে খালের দুই তির, পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্থাপনা, বাঁধ, ব্রিজ ও কালভার্টের নিরাপত্তা এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খননের বিষয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলগত মতামত নেওয়া হয়নি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, স্বেচ্ছাশ্রমের নামে খালটির বিশাল অংশ থেকে মাটি ও বালু খনন করলে এলাকায় পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। বর্ষা মৌসুমে খালটি ভেঙে বিশাল এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এছাড়া বদলির আদেশ হওয়ার পর তড়িঘড়ি করে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ইউএনও এই কার্যাদেশ দিয়ে যান বলে তারা অভিযোগ করেন। জানতে চাইলে সাতকানিয়া উপজেলার সদ্য বিদায়ি নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি। নিয়ম মেনেই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল।

















