চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসানকে অপহরণ করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় চাকরিচ্যুত সাবেক সেনা সদস্যসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণে জড়িত চক্রটির নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক সেনা সদস্য সুমন মুন্সি। তার বিরুদ্ধে ভুয়া এসআরবি পরিচয়ে অপরাধসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৩টি মামলার তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম। এর আগে বুধবার ভোরে কক্সবাজারের টেকনাফের লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫-সংলগ্ন এলাকা থেকে অপহৃত ব্যবসায়ীকে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও বাঁশখালী থানা পুলিশ।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন- গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার সুমন মুন্সি, কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার মিজানুর রহমান, উখিয়া উপজেলার জয়নাল উদ্দিন, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার আব্বাস উদ্দিন, টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৬-এর বাসিন্দা ছলিম ওরফে সেলিম এবং কক্সবাজার সদর উপজেলার দেলোয়ার হোসেন।
পুলিশ জানায়, চক্রটির সদস্যরা কালো পোশাক, এসআরবি লেখা জ্যাকেট, ভুয়া পরিচয়পত্র ও হ্যান্ডকাফ ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে লোকজনকে তুলে নিয়ে যেতেন। পরে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করতেন। সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে তথ্য সংগ্রহ ও অপহরণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চক্রের অন্য সদস্যরা সহযোগিতা করতেন।
শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাঁশখালী উপজেলার পুঁইছড়ির প্রেমবাজারে মেসার্স আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজ নামের হার্ডওয়্যারের দোকানে বসেছিলেন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসান। এ সময় কালো পোশাকের ওপর এসআরবি লেখা জ্যাকেট, মাথায় কালো ক্যাপ ও মুখে মাস্ক পরা কয়েকজন ব্যক্তি দোকানে প্রবেশ করেন। এসআরবি সদস্য পরিচয় দিয়ে ব্যবসায়ীর যমজ ভাই মো. হোছাইনের ছবি দেখিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করেন।
একপর্যায়ে ব্যবসায়ী নিজের পরিচয় দিলে তারা দুই হাত পেছনে নিয়ে হ্যান্ডকাফ পরান। এরপর দোকান থেকে বের করে অজ্ঞাত একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যান। পরে বিভিন্ন যানবাহনে স্থানান্তর করে কক্সবাজারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
অপহরণের কয়েক ঘণ্টা পর ওই দিন রাত ১১টা ৪০ মিনিট থেকে ব্যবসায়ীর স্ত্রী ও দোকানের ব্যবস্থাপকের মুঠোফোনে বিভিন্ন ভিওআইপি নম্বর থেকে কল আসতে থাকে। ফোনে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ব্যবসায়ীকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় ব্যবসায়ীর ভাই মো. হোছাইমের এজাহারের ভিত্তিতে বাঁশখালী থানায় মামলা হয়। অপহরণের পরপরই অভিযান শুরু করে পুলিশ। মঙ্গলবার কক্সবাজার সদর থানার বাস টার্মিনাল, বাংলাবাজার ও কোর্টবাজার এলাকা থেকে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার ভোর ৪টার দিকে টেকনাফের লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫-সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ব্যবসায়ীকে উদ্ধার করা হয়।
এ সময় অপহরণে ব্যবহৃত একটি ব্যক্তিগত গাড়ি, এসআরবি লেখা পাঁচটি কালো জ্যাকেট, দুটি ভুয়া এসআরবি পরিচয়পত্র ও একটি হ্যান্ডকাফ জব্দ করা হয়।
পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, সাবেক সেনা সদস্য সুমন মুন্সি আগে উখিয়া এলাকায় র্যাবে কর্মরত ছিলেন। সে সময় রোহিঙ্গাদের কয়েকজনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে চাকরিচ্যুত ও কারাভোগের পর তিনি বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের নিয়ে ভুয়া এসআরবি দল গড়ে তোলেন।
তিনি আরও বলেন, আব্বাস উদ্দিন ও দেলোয়ার হোসেন বিভিন্ন স্থানে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সুমনকে তথ্য দিতেন। এরপর সুমন ও তার সহযোগীরা ভুয়া এসআরবি পরিচয় ব্যবহার করে অপহরণ এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতেন। সুমন মুন্সির বিরুদ্ধে ছিনতাই, দস্যুতা ও অস্ত্র আইনে মোট ১৩টি মামলা রয়েছে।

















