মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ ত্বরান্বিত করার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

35

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ পণ্য খালাসের গতি ত্বরান্বিত করা ও আধুনিকায়নের কাজ এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার সেখানে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি শেষে বিকালে রাজধানীতে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

Advertisement

মোংলা বন্দরের জেটি ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সব কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। দুপুরে মোংলায় পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি মোংলা বন্দর এবং পার্শ্ববর্তী প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (Economic Zone) সামগ্রিক অবকাঠামো ও কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করেন।

পরিদর্শনকালে তিনি মেগা প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক চ্যানেল ড্রেজিং, কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা এবং নতুন এলএনজি (LNG) টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন। পরে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক ভবনে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। সভায় বন্দর কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী নেতা এবং সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। মতবিনিময় সভায় মোংলা বন্দরকে আঞ্চলিক বাণিজ্যকেন্দ্র (Regional Hub) হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়। বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে কানেক্টিভিটি বৃদ্ধি, আধুনিক লজিস্টিকস সুবিধা সম্প্র্রসারণ এবং প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে দ্রুত অবকাঠামোগত জটিলতা নিরসনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রীর এই গুরুত্বপূর্ণ সফরকে কেন্দ্র করে পুরো মোংলা, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা এবং খুলনা-বাগেরহাট সীমানায় অভূতপূর্ব নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়। র‍্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর যৌথ সমন্বয়ে কয়েক স্তরের কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে স্থানীয় প্রশাসন। নৌপথ ও আকাশপথে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হয়। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে বাগেরহাট ও খুলনা অঞ্চলের ব্যবসায়ী সমাজ এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উত্সাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতৃবৃন্দ এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, মোংলা বন্দর দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। এই বন্দরের আধুনিকায়ন, বিশেষ করে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল ও এলএনজি টার্মিনাল দ্রুত বাস্তবায়িত হলে এই অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ দেশি ও বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) আসবে। স্থানীয় বাসিন্দারা আশা প্রকাশ করছেন, পদ্মা সেতু ও খুলনা-মোংলা রেলপথের পূর্ণ ব্যবহারের পাশাপাশি এই প্রকল্পগুলো পুরোপুরি কার্যকর হলে মোংলাকেন্দ্রিক বিশাল শিল্প বেল্ট গড়ে উঠবে। গতকাল সকালে ঢাকা থেকে বিশেষ হেলিকপটারযোগে যাত্রা শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী। সকাল ১০টার দিকে মোংলায় পৌঁছানোর আগে তিনি হেলিকপটার ও জলযানে খুলনা এবং সুন্দরবন-সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকা ঘুরে দেখেন। খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ নলিয়ান এলাকায় নেমে জলযানে নৌবাহিনীর বানৌজা মোংলা ঘাঁটিতে পৌঁছে সেখান থেকে সরাসরি বন্দরের জেটি এলাকায় যান তিনি। বন্দরের প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশের সময় সেখানে জড়ো হওয়া বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান। পরিদর্শনকালে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন। তারা বন্দরের বিভিন্ন অবকাঠামো ও উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পর্কে তাকে অবহিত করেন।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানান, সকালে ঢাকা থেকে মোংলার উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। পথে সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্টে প্রস্তাবিত এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের জায়গা আকাশপথে দেখেন তিনি। পরে মোংলার দিগরাজে নৌবাহিনীর ঘাঁটিতে যান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে খুলনা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বিকালে মোংলা বন্দরের মূল জেটি পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় বন্দরে পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ দেখেন এবং বন্দরের উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন নিয়ে কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন। এরপর বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শন করেন তিনি। দিনের সফর শেষে বিকাল ৫টা ২০ মিনিটে মোংলার হেলিপ্যাড থেকে হেলিকপটারে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী।

সুন্দরবন দেখলেন প্রধানমন্ত্রী, বনে নামল না হেলিকপটার

হেলিকপটারে করে সুন্দরবন ঘুরে দেখেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে বনের প্রাণপ্রকৃতির ক্ষতি এড়াতে তার হেলিকপটারটি সুন্দরবনের কোথাও নামেনি বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী হেলিকপটারটি সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্ট, হিরণ পয়েন্ট ও ত্রিকোণ আইল্যান্ডের আশপাশ দিয়ে উড়ে যায়। পরে হেলিকপটারটি খুলনার দাকোপ উপজেলার নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে নামে।

প্রটোকল ভেঙে জনগণের সঙ্গে কুশল বিনিময় করলেন প্রধানমন্ত্রী

মোংলা বন্দরের জেটি ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সব কার্যক্রম সরেজমিনে ঘুরে পর্যবেক্ষণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় তিনি প্রটোকল ভেঙে গাড়ি থেকে নেমে জনগণের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে বন্দর জেটিতে প্রবেশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি প্রায় ৫০ মিনিট মোংলা বন্দর এলাকা পরির্দশন করেন। এরপর সোয়া ৪টার দিকে জেটি থেকে বের হয়ে বেজার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের দিকে রওয়ানা হন। এ সময়ে পথে দলীয় নেতাকর্মীদের টানে প্রটোকল ভেঙে গাড়ি থেকে নেমে জনগণের সঙ্গে মিশে যান প্রধানমন্ত্রী। তিনি হাত নেড়ে সবাইকে শুভেচ্ছা জানান এবং কয়েক জনের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।

প্রধানমন্ত্রীর সফর :উপকূলে অভূতপূর্ব জাগরণ

খুলনার দাকোপের নলীয়ান, মোংলা বন্দরে জেটি ও ইকোনমিক জোন এলাকায় দিনভর ছিল উত্সবের রঙে রঙিন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মোংলা সমুদ্র বন্দরের হিরণপয়েন্টে এলএমজি স্টেশন ও ইকোনমিক জোন সফরকে কেন্দ্র করে বন্দরের পশুর নদী সুন্দরবনঘেঁষা পুরো উপকূলীয় অঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছে এক অভূতপূর্ব জাগরণ।

প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে মোংলা বন্দর ও প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল রূপ নেয় হাজারো মানুষের জনসমুদ্রে। মোংলা পোর্ট পৌরসভার সাবেক মেয়র ও বিএনপি মোংলা পৌর শাখার সভাপতি মো. জুলফিকার আলী এবং মোংলা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল মান্নান হাওলাদার, সাধারণ সম্পাদক আবু হোসেন পনি, মাহবুবুর রহমান মানিকের নেতৃত্বে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণ বন্দর এলাকায় সমবেত হন।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, এ অঞ্চলের সার্বিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে শিল্পায়নের কোনো বিকল্প নেই। প্রধানমন্ত্রী মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, বেজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের কার্যক্রম এবং সুন্দরবনের পরিবেশগত বিষয় ও পর্যটন সম্ভাবনার ওপর সরাসরি নজর দিতেই এখানে সফর করেছেন। আমরা বিশ্বাস করি, এই ঐতিহাসিক পরিদর্শনের ফলে মোংলা বন্দর, ইকোনমিক জোন, ইপিজেড এবং সমগ্র শিল্পাঞ্চলের বাণিজ্যিক সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এবং বন্দর ব্যবসায়ী মো. জুলফিকার আলী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রস্তাবিত নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চীনের সঙ্গে চুক্তি হওয়া নতুন জেটি ও এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের স্থান পরিদর্শন মোংলা অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো তৈরি হলে তা সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতিতে অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

Advertisement