মেহেদী হাসান: একজন মানুষ রাতে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরছেন। তাঁর কাছে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই, কোনো সন্ত্রাসী বাহিনী নেই, কোনো প্রভাবশালী আত্মীয় নেই। আছে শুধু তাঁর দোকান, তাঁর পরিবার আর রাষ্ট্রের ওপর সামান্য একটু বিশ্বাস।
এই মানুষটি যদি হঠাৎ ভাবতে শুরু করেন ‘আমার সঙ্গে অন্যায় হলে আমাকে কে রক্ষা করবে?’ তাহলে সমস্যাটা শুধু একটি অপরাধের নয়। সমস্যাটা রাষ্ট্রের। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা আমাদের সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুর। আশুলিয়ায় একটি মাদ্রাসায় দলবদ্ধ হামলা ও লুটপাট। রাজশাহীতে দোকানি আবদুল বারীকে কুপিয়ে হত্যা। মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও স্থাপনা ধ্বংস।
ঘটনাগুলোর চরিত্র এক নয়। কারণও এক নয়। তাই সবকিছুকে এক বাক্যে ‘রাজনৈতিক সহিংসতা’ বলা যেমন দায়িত্বশীল হবে না, তেমনি এগুলোকে বিচ্ছিন্ন কিছু অপরাধ বলে পাশ কাটিয়েও যাওয়া যায় না।
কারণ প্রতিটি ঘটনার ভেতরে একটি অভিন্ন প্রশ্ন আছে, আইনের ভয় কি আমাদের সমাজে কমে যাচ্ছে? সালমান মুক্তাদিরের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথমে চাঁদাবাজির অভিযোগ সামনে আসে। পরে পুলিশ জানায়, তাদের প্রাথমিক তদন্তে বিষয়টি জমি-সংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে হচ্ছে। ৩ থেকে পরে ৫ জনকে গ্রেপ্তারের খবরও এসেছে; তদন্ত এখনো চলছে। অর্থাৎ সত্যটি এখনো তদন্তের ভেতরে। কিন্তু ঘটনাটি আমাদের অন্য একটি প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়। জমি নিয়ে বিরোধ হলে তার সমাধান কি আদালতে হবে, নাকি দলবল নিয়ে রাতের আঁধারে জমি দখল করতে যেতে হবে? যদি দ্বিতীয়টি সম্ভব হয়, তাহলে শুধু জমির মালিক নয় রাষ্ট্রের আইনও সেখানে আক্রান্ত হয়।
আশুলিয়ার মাদ্রাসার ঘটনাতেও ব্যবস্থাপনা ও দখল নিয়ে বিরোধের কথা এসেছে। ৫০–৬০ জন মানুষ হামলা চালিয়েছে এমন অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তির নামও এসেছে, যদিও অভিযুক্ত ব্যক্তি সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এখানে একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হলেই সে অপরাধী এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। কিন্তু কোনো অপরাধে রাজনৈতিক পরিচয়ের ছায়া থাকলে সেটি তদন্তের বাইরে রাখাও যায় না। আইনের চোখে রাজনৈতিক পরিচয় যেন ঢাল না হয় এটাই আসল কথা।
রাজশাহীর আবদুল বারীর ঘটনাটি আরও ভয়ংকর।
একটি সাধারণ বিরোধের পর ৫০–৫৫ জনের একটি দল অস্ত্র ও পেট্রলবোমা নিয়ে দোকানে হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। দোকানে আগুন দেওয়ার পর বারীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং একজনকে গ্রেপ্তারের খবর দিয়েছে পুলিশ। একজন মানুষকে হত্যা করতে এতজন মানুষের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু এতজন মানুষ যদি একটি দোকানে হামলা করতে একত্রিত হয়, তাহলে প্রশ্নটা শুধু হত্যাকারীদের নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো এত বড় একটি দল কীভাবে এতদূর এল? তারা কি ধরে নিয়েছিল পুলিশ আসবে না? তারা কি ধরে নিয়েছিল আইন তাদের থামাবে না? নাকি তারা জানত, কোনো না কোনো পরিচয়, প্রভাব কিংবা শক্তি তাদের রক্ষা করতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আসলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গভীরে নিয়ে যায়।
সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিকর হয় মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনা। একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়া এবং ভবনের অংশ ধ্বংস করা হয়েছে। ঘটনাটি ঠেকাতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। পরে তদন্তে দায়িত্বে থাকা পুলিশের অবহেলার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে; থানার ওসিকেও প্রত্যাহার করা হয়েছে। এখানে রাষ্ট্রের প্রশ্নটি আর তাত্ত্বিক থাকে না। কারণ পুলিশ যদি ঘটনাস্থলে থেকেও একটি হামলা ঠেকাতে না পারে, তাহলে সাধারণ নাগরিকের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগবে। তাহলে আমাকে রক্ষা করবে কে? এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রকে দিতেই হবে। রাষ্ট্র কি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে? আমি এত দ্রুত এমন সিদ্ধান্তে যেতে চাই না। কারণ কয়েকটি আলোচিত ঘটনা দিয়ে পুরো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চূড়ান্ত চিত্র আঁকা যায় না। অপরাধের পরিসংখ্যান, মামলা, তদন্ত, গ্রেপ্তার, বিচার সব মিলিয়ে পরিস্থিতি বুঝতে হবে। কিন্তু রাষ্ট্রের শক্তি শুধু পরিসংখ্যানে মাপা যায় না। রাষ্ট্রের শক্তি মাপা যায় একজন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ দিয়ে। একজন দোকানি যদি মনে করেন তাঁর দোকান রক্ষা করতে তাঁকে রাজনৈতিক পরিচয় দরকার, একজন ব্যবসায়ী যদি মনে করেন জমি রক্ষা করতে তাঁকে পেশিশক্তির আশ্রয় নিতে হবে, একজন প্রতিষ্ঠানপ্রধান যদি মনে করেন কোনো দলবল তাঁর প্রতিষ্ঠান দখল করে নিতে পারে তাহলে রাষ্ট্রের উপস্থিতি কাগজে থাকলেও নাগরিকের জীবনে তার উপস্থিতি কমে যায়। এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা। রাজনীতি কি দায়ী? হ্যাঁ, রাজনৈতিক পরিবেশের প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু ‘রাজনীতি দায়ী’ বলা আর ‘অমুক রাজনৈতিক দল দায়ী’ বলা এক কথা নয়। একটি সমাজে যখন দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতা মানে সুযোগ, পরিচয় মানে সুরক্ষা এবং দলীয় সংযোগ মানে প্রভাব এমন ধারণা তৈরি হয়, তখন অপরাধের সংস্কৃতিও তার সুযোগ নেয়। ক্ষমতার সংস্কৃতি তখন ধীরে ধীরে সমাজে নেমে আসে। একজন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ভাবেন, তাঁর লোকজন আছে। একজন ব্যবসায়ী ভাবেন, তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগ আছে। একজন অপরাধী ভাবেন, তাঁর পেছনে কেউ আছে। আর সাধারণ মানুষ ভাবেন ‘আমার তো কেউ নেই।’ এই ‘কেউ নেই’ অনুভূতিটাই রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। রাষ্ট্রের কাজ শুধু অপরাধী ধরা নয় আমরা প্রায়ই বলি ‘অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে হবে।’ অবশ্যই করতে হবে। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার চেয়ে বড়। রাষ্ট্রকে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে যেখানে অপরাধী অপরাধ করার আগেই জানবে সে পার পাবে না।এটাই আইনের শাসন। অপরাধ করার পর গ্রেপ্তার হওয়া হলো রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া। অপরাধ করার সাহস না পাওয়া হলো রাষ্ট্রের সক্ষমতা। দুটির মধ্যে পার্থক্য আছে। একটি কার্যকর রাষ্ট্র প্রতিটি হামলার পরে শুধু মামলা করে না; সে এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করে যেখানে মানুষ জানে—বিরোধ হলে আদালতে যেতে হবে, প্রশাসনের কাছে যেতে হবে, পুলিশের কাছে যেতে হবে।
দলবল নিয়ে গিয়ে কারও জমি দখল করা যাবে না।
অস্ত্র নিয়ে দোকানে হামলা করা যাবে না। রাজনৈতিক পরিচয় দেখিয়ে কাউকে ভয় দেখানো যাবে না। আর পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখবে এটিও চলবে না।
আমি যে বাংলাদেশ চাই
আমি এমন রাষ্ট্র চাই না যেখানে পুলিশ সর্বত্র ভয় দেখাবে। আমি এমন রাষ্ট্র চাই যেখানে পুলিশকে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন হবে না কারণ পুলিশ নাগরিকের পাশে থাকবে। আমি এমন রাষ্ট্র চাই না যেখানে সরকারের সমালোচনা করলেই নাগরিক নিরাপত্তাহীন বোধ করবে। আমি এমন রাষ্ট্র চাই যেখানে সরকারের সমালোচনা করাও নাগরিকের অধিকার, আর সেই নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমি এমন রাষ্ট্র চাই না যেখানে ধনী ও ক্ষমতাবান মানুষের জন্য আলাদা আইন থাকবে। আমি এমন রাষ্ট্র চাই যেখানে একজন দিনমজুর, একজন দোকানি, একজন শিক্ষক, একজন সাংবাদিক, একজন উদ্যোক্তা সবাই একই আইনের কাছে সমান।
কারণ রাষ্ট্রের আসল পরীক্ষা হয় ক্ষমতাবানকে কতটা সুবিধা দেওয়া যায়, সেখানে নয়। রাষ্ট্রের আসল পরীক্ষা হয় দুর্বল মানুষটি অন্যায়ের শিকার হলে তাকে কতটা দ্রুত পাশে দাঁড় করানো যায়।
এখন সবচেয়ে প্রয়োজন কী?
আমাদের এখন আতঙ্ক ছড়ানোর দরকার নেই। দরকার সত্য জানা। প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দরকার। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধের প্রমাণ দেখতে হবে। পুলিশের গাফিলতি থাকলে পুলিশকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। আর কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় যেন অপরাধীর জন্য ঢাল না হয়ে ওঠে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের সমাজকেও একটি কঠিন প্রশ্ন করতে হবে। আমরা কি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি চাই, যেখানে শক্তিই শেষ কথা?
যদি না চাই, তাহলে আইনকে শক্তিশালী করার কাজ শুধু সরকারের নয়। রাজনৈতিক দলেরও।প্রশাসনেরও। পুলিশেরও। আদালতেরও। এমনকি আমাদেরও। কারণ আইনশৃঙ্খলা শুধু পুলিশের বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সামাজিক চুক্তির বিষয়। রাষ্ট্র নাগরিককে বলবে ‘তুমি আইন মানো, আমরা তোমাকে নিরাপত্তা দেব।’ নাগরিক আইন মানবে, রাষ্ট্রও তার দায়িত্ব পালন করবে। এই চুক্তি ভেঙে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই মানুষটি, যার কোনো বাহিনী নেই, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই, কোনো ক্ষমতাবান বন্ধু নেই। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ। আর একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্বই তো সেই সাধারণ মানুষটির পাশে দাঁড়ানো। আজ তাই প্রশ্নটা শুধু ‘অপরাধী কে?’ এখানে থামানো যাবে না। প্রশ্ন করতে হবে, কেন তারা এতটা নির্ভীক হলো? কেন একজন মানুষ অন্যের সম্পত্তি দখল করতে দলবল নিয়ে যেতে পারে? কেন কয়েক ডজন মানুষ একটি দোকানে হামলা করার সাহস পায়? কেন একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংস করতে এত মানুষ জড়ো হতে পারে?
আর কেন একজন সাধারণ নাগরিক এখনো ভাবেন ‘আমার সঙ্গে কিছু হলে, আমাকে রক্ষা করার মতো কেউ কি আছে?’ এই প্রশ্নের উত্তর যদি রাষ্ট্র দিতে না পারে, তাহলে শুধু আইনশৃঙ্খলা নয় রাষ্ট্রের ওপর মানুষের আস্থাই সংকটে পড়বে।
আর আস্থা একবার ভেঙে গেলে, কোনো সরকার, কোনো দল, কোনো পুলিশ বাহিনী একা সেটি ফিরিয়ে আনতে পারে না। কারণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি বন্দুক নয়। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো একজন সাধারণ মানুষের এই বিশ্বাস যে, অন্যায় হলে শেষ পর্যন্ত আইন তার পাশে দাঁড়াবে। সেই বিশ্বাসটুকু রক্ষা করাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক, সামাজিক এবং মানবিক দায়িত্ব।
লেখক: শিক্ষানবীশ লেখক ও সাংবাদিক।
















