৭ নভেম্বর: ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ, সৈনিক-জনতার অভ্যুত্থান ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পথপরিক্রমা

আমি মেজর জিয়া বলছি

30

বিশেষ নিবন্ধ | চট্টলা নিউজ ডেস্কঃ “ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানো মানে শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়, বরং ভবিষ্যতের পথচলায় অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া।”

Advertisement

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অস্থির ও ঘটনাবহুল সময়। সদ্য স্বাধীন একটি রাষ্ট্র তখন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং ধারাবাহিক ক্ষমতার পালাবদলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সামরিক বাহিনীতে শৃঙ্খলা এবং নেতৃত্বের প্রশ্নটি তখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

এই প্রেক্ষাপটেই আসে ৭ নভেম্বর। ইতিহাসের পাতায় দিনটি পরিচিত হয়ে ওঠে ‘সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান’ হিসেবে। বিএনপি দিনটিকে পালন করে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে। দলটির রাজনৈতিক ইতিহাস, প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা এবং বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিকাশের সঙ্গে দিনটির সম্পর্ক গভীর।

যে প্রেক্ষাপটে এসেছিল ৭ নভেম্বর

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন। এরপর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন। একই বছরের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। সে সময় সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তাঁর বাসভবনে অন্তরীণ করা হয়।

পরবর্তী ৭ নভেম্বর সেনাবাহিনীর একাংশের সদস্যদের অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান মুক্ত হন। ওই ঘটনাপ্রবাহে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও দেখা যায়। এর মধ্য দিয়ে দেশের সামরিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন পরিবর্তনের সূচনা হয়।

তবে ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। বিএনপি একে সৈনিক-জনতার বিপ্লব ও জাতীয় সংহতির প্রতীক হিসেবে দেখে। অন্যদিকে জাসদ দিনটিকে সিপাহি-জনতার বিপ্লব হিসেবে স্মরণ করে এবং অন্যান্য রাজনৈতিক পক্ষ ঘটনাটির ভিন্ন মূল্যায়ন করে। ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ পাঠের জন্য এসব ব্যাখ্যা ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি।

জিয়াউর রহমান: মুক্তিযুদ্ধের সেনানায়ক থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্বে

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি। তিনি ১৯৭১ সালে একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং জেড ফোর্সের অধিনায়কত্ব করেন। স্বাধীনতার পর সামরিক বাহিনীতে বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ২৫ আগস্ট তিনি সেনাপ্রধান নিযুক্ত হন।

৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। পরবর্তী সময়ে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল – বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন।

তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা, স্বনির্ভরতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়গুলো বিশেষভাবে আলোচিত। তাঁর শাসনামল ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে যেমন সমর্থকদের ইতিবাচক মূল্যায়ন রয়েছে, তেমনি ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে সমালোচনাও রয়েছে।

বিএনপির কাছে ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক দিবস। দলটির দৃষ্টিতে, ১৯৭৫ সালের এই দিনটি ছিল রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় সংহতির প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান এবং পরবর্তী সময়ে বিএনপির প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের সঙ্গে দিনটি অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।

বিএনপির কাছে ৭ নভেম্বর কেবল একটি ঐতিহাসিক তারিখ নয় বরং এটি দলটির প্রতিষ্ঠাতা নেতার রাজনৈতিক উত্থান, জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারার বিকাশ এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের রাজনৈতিক দর্শনের স্মারক।

ইতিহাসের শিক্ষা: সংহতি, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব

পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। এই দিনটি স্মরণ করিয়ে দেয়, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, সামরিক বাহিনীর পেশাদারত্ব, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং জনগণের অধিকার একটি দেশের ভবিষ্যতের সঙ্গে কতটা গভীরভাবে সম্পর্কিত।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার জনগণ। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং আইনের শাসনের প্রশ্নে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা যেকোনো সময়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৬ সালে ৭ নভেম্বরের ৫১তম বার্ষিকীতে দিবসটির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সরকারি ছুটি পুনর্বহাল হওয়াও নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। ১৬ বছর পর দিবসটি আবার রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হচ্ছে। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়কে নতুন করে পর্যালোচনা করারও একটি উপলক্ষ।

Advertisement