চন্দনাইশে ৩৬০ বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের স্মৃতি ধারণ করে আসছে বাগ-ই-শাহ ও কদমে রাসূল

26

এম হেলাল উদ্দিন নিরবঃ প্রাচীন স্থাপনা, ধর্মীয় আবেগ এবং মুঘল আমলের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় স্মৃতিচর্চা—সব মিলিয়ে চন্দনাইশের বাগিচাহাট খাঁন শাহী জামে মসজিদ ও ‘বাগ-ই-শাহ’ কবরস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যস্থল হিসেবে পরিচিত। চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার (আরাকান) মহাসড়কের পাশে অবস্থিত এই স্থাপনাটির বয়স প্রায় সাড়ে তিন শতাব্দী বলে স্থানীয়ভাবে দাবি করা হয়।

Advertisement

মসজিদের দক্ষিণ পাশে সীমানাপ্রাচীরবেষ্টিত চত্বরে রয়েছে ২২টি প্রাচীন কবর, যেগুলো স্থানীয়ভাবে মুঘল সেনাদের সমাধি হিসেবে পরিচিত। মসজিদের উত্তর পাশের একটি কক্ষে দুটি পাথর সংরক্ষিত রয়েছে; এগুলো মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও গাউছুল আজম হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর পায়ের ছাপসংবলিত বলে প্রচলিত।

ধর্মীয় অনুভূতি, স্থানীয় জনশ্রুতি ও ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনায় সমৃদ্ধ এই স্থাপনাকে ঘিরে রয়েছে নানা কাহিনি। সময়ের সঙ্গে স্থাপনার অবয়ব বদলালেও এর ঐতিহাসিক পরিচিতি স্থানীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। চন্দনাইশ ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের ইতিহাস-ঐতিহ্য বোঝার ক্ষেত্রে স্থানটি সম্ভাবনাময় হলেও এর বিষয়ে আরও প্রামাণ্য গবেষণা প্রয়োজন বলে সচেতনমহলের দাবি।

তবে স্থানীয় ইতিহাস ও প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, ১৬৬৬ সালে মুঘল শাসনামলে মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় চট্টগ্রাম অঞ্চলে মুঘল আধিপত্য বিস্তার এবং দোহাজারীর সাঙ্গু নদীর তীর পর্যন্ত সীমানা নির্ধারণের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে এই এলাকার ইতিহাস যুক্ত বলে স্থানীয়রা মনে করেন। ওই ঘটনার অভিযানে নিহত ২২ জন মুঘল সেনাকে মসজিদের দক্ষিণ পাশে সমাহিত করা হয়েছিল—এমন দাবি প্রচলিত রয়েছে।

তবে কবরগুলোর সময়কাল ও পরিচয় নিশ্চিত করার মতো প্রত্নতাত্ত্বিক বা লিখিত প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। কবরস্থানটি ‘বাগ-ই-শাহ’ নামে পরিচিত। ‘বাগ-ই-শাহ’ শব্দবন্ধের সঙ্গে বাদশাহদের বাগান বা মুঘলদের বাগিচার ধারণা যুক্ত বলে স্থানীয়ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। জনশ্রুতি রয়েছে, একসময় এখানে মুঘলদের বাগান ও ভান্ডারখানা ছিল। ভান্ডারখানার স্মৃতি থেকে পার্শ্ববর্তী এলাকাটি ‘ভান্ডারীপাড়া’ নামের প্রচলন এবং বাগানকে কেন্দ্র করে ‘বাগিচাহাট’ নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।

মসজিদের পাশে থাকা ২২টি কবর স্থানীয় মানুষের কাছে অতীতের রাজনৈতিক ও সামরিক ঘটনাপ্রবাহের স্মারক। তবে কবরগুলোর পরিচয়, সেখানে সমাহিত ব্যক্তিদের পদমর্যাদা এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনার বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করতে ঐতিহাসিক দলিল, প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ ও বিশেষজ্ঞ গবেষণা প্রয়োজন বলে দাবি করেন সচেতনমহল।

খাঁন জামে মসজিদের উত্তর পাশে অবস্থিত একটি কক্ষে দুটি পাথর সংরক্ষিত রয়েছে। এগুলো মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও বড়পীর হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর পায়ের ছাপসংবলিত স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে পরিচিত। প্রচলিত বর্ণনায় একটি পাথরে মহানবী (সা.)-এর বাম পায়ের ছাপ এবং অন্যটিতে আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর ডান পায়ের ছাপ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে এগুলো ‘কদম রাসুল’ বা ‘কদম মোবারক’ হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ। তবে পাথরগুলোর উৎস ও সত্যতা সম্পর্কে ধর্মীয় বিশ্বাসের বাইরে ঐতিহাসিক বা বৈজ্ঞানিক যাচাই হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

স্থানীয় ঐতিহ্যবিষয়ক বর্ণনা অনুযায়ী, সুফি সাধক আধু খাঁর সঙ্গে চট্টগ্রামের তৎকালীন ফৌজদার ওয়াশিকার একটি ঘটনা এই স্মৃতিচিহ্নগুলোর সঙ্গে যুক্ত। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, আধু খাঁর বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে ফৌজদার ওয়াশিকা তাঁকে সম্মান জানান এবং পবিত্র মক্কা নগরী থেকে আনা পায়ের ছাপসংবলিত পাথর উপহার দেন। পরে আধু খাঁ তাঁর বাগানবাড়িতে অবস্থিত খাঁন মসজিদে সেগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।

অন্য একটি বর্ণনায় সুফি সাধক ও ইসলাম প্রচারক শাহ সুফি শেরে জামান খাঁ (রহ.)-এর নামও স্মৃতিচিহ্নগুলোর ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তিনি পবিত্র মক্কা বা মদিনা থেকে এসব পাথর সংগ্রহ করেছিলেন বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। তবে পাথরগুলোর প্রকৃত উৎস, সংগ্রহের সময় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে বর্ণনাগুলোর মধ্যে পার্থক্য আছে।

জনশ্রতি অনুযায়ী, একসময় মসজিদ ও সংলগ্ন স্থাপনাগুলো চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত দেয়ালবেষ্টিত ছিল। এক গম্বুজবিশিষ্ট প্রাচীন স্থাপনার নির্মাণশৈলীতে মুঘল আমলের স্থাপত্যরীতির প্রভাব ছিল দাবি প্রবীণদের। তবে স্থাপত্যের উপাদান, নির্মাণকাল ও সংস্কারপর্ব বিশ্লেষণ ছাড়া এ দাবিকে নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।

সরেজমিনে গিয়ে যায়, দীর্ঘ সময় সংস্কারের অভাব ও অবহেলার কারণে মসজিদ, কবরস্থান এবং কদম রাসুলের কক্ষের অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় প্রবীণ মুরুব্বী স্থানীয় আলী হোসেন বলেন, ১৯৭৭ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সুফি সাধক শামসুদ্দীন আহমদ হাশিমপুরী (রহ.)-এর উদ্যোগে এসব স্থাপনার সংরক্ষণ ও সংস্কারের কার্যক্রম শুরু হয়। আহলে সুন্নাত আঞ্জুমানের মাধ্যমে বাগ-ই-শাহ ও খাঁন মসজিদের দেখভালের উদ্যোগ নেওয়া হয় বলেও তিনি জানান।

স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে, একসময় মসজিদ ও সংলগ্ন স্থাপনাগুলো চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত দেয়ালবেষ্টিত ছিল। এক গম্বুজবিশিষ্ট প্রাচীন স্থাপনার নির্মাণশৈলীতে মুঘল আমলের স্থাপত্যরীতির প্রভাব ছিল বলেও স্থানীয়ভাবে দাবি করা হয়। তবে স্থাপত্যের উপাদান, নির্মাণকাল ও সংস্কারপর্ব বিশ্লেষণ ছাড়া এ দাবিকে নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। দীর্ঘ সময় সংস্কারের অভাব ও অবহেলার কারণে মসজিদ, কবরস্থান এবং কদম রাসুলের কক্ষের অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।

পরে ১৯৭৭ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সুফি সাধক শামসুদ্দীন আহমদ হাশিমপুরী (রহ.)-এর উদ্যোগে এসব স্থাপনার সংরক্ষণ ও সংস্কারের কার্যক্রম শুরু হয় বলে স্থানীয় সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। এবং আহলে সুন্নাত আঞ্জুমানের মাধ্যমে বাগ-ই-শাহ ও খাঁন মসজিদের দেখভালের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাঁর এই উদ্যোগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রচেষ্টায় স্থাপনাগুলোর সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ এগিয়ে যায় বলে স্থানীয়দের মাধ‍্যমে জানা যায়।

বর্তমানে মসজিদটি সংস্কার ও পরিবর্তনের ফলে ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে বলে জানিয়েছেন মুসল্লিরা। তবে এর অতীত স্থাপত্যের কিছু স্মৃতি এখনও রয়ে গেছে।

আহলে সুন্নাত আঞ্জুমানের বর্তমান পরিচালক মহিউদ্দিন হিরু বলেন, ১৯৭৭ সালে সুফী সাধক বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুদ্দিন আহমদ হাশিমপুরী (রহঃ) বাগ ই শাহ এর রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের জন‍্য আহলে সুন্নাত আন্জুমান নামে সংগঠনটি গঠন করেন।

Advertisement