মোঃ আশরাফ উদ্দীন: ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে থমকে যেতে পারত জীবনের সব আনন্দ ও সম্ভাবনার দুয়ার, কিন্তু অদম্য মানসিক শক্তির সামনে হার মেনেছে শারীরিক অক্ষমতাও। সীতাকুণ্ডে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় দুই হাত হারানোর পর জীবনের চরম বাস্তবতায় দমে যাননি তরুণ ছাত্র মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম রাব্বি। শত প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় চট্টগ্রাম সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পা দিয়ে লিখে জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন তিনি। তাঁর এই অসাধারণ ও বিরল সাফল্য এখন পুরো সীতাকুণ্ডের মানুষের মুখে মুখে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সর্বস্তরের মানুষের প্রশংসায় ভাসছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সীতাকুণ্ড উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ভাটিয়ারী ইউনিয়নের এক অসচ্ছল দিনমজুর পরিবারের সন্তান রাব্বি। ২০১৬ সালে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময় এক ভয়াবহ বিদ্যুৎ দুর্ঘটনায় চিকিৎসকরা তাঁর দুটি হাত কেটে ফেলতে বাধ্য হন। সেই কঠিন বিপর্যয় কাটিয়ে উঠে প্রথমে মুখ দিয়ে এবং পরবর্তীতে অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে পা দিয়ে লেখার অভ্যাস রপ্ত করেন রাব্বি। পরিবারের সহযোগিতা ও নিজের চরম অধ্যাবসায়ে এর আগে ২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন। ধারাবাহিক সাফল্য বজায় রেখে চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষাতেও পা দিয়ে লিখে কৃতিত্বের সাথে জিপিএ-৫ লাভ করলেন তিনি।
নিজের এই অদম্য অর্জন ও অনুভূতির কথা জানিয়ে কৃতী শিক্ষার্থী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম রাব্বি বলেন, “২০১৬ সালে বিদ্যুৎ দুর্ঘটনায় দুটি হাত হারানোর পর যখন চারপাশ অন্ধকার দেখছিলাম, তখন আম্মা ও পরিবারের সবাই আমার পাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়েছিলেন। হাত না থাকলেও আল্লাহর রহমতে আমার ব্রেন আর পা সচল ছিল। মুখ আর পা দিয়ে লেখার তীব্র অনুশীলনের পর আজ এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করে একজন বিজ্ঞানী হতে চাই, যাতে সমাজের সেবা করতে পারি।”
ছেলের এই দীর্ঘ সংগ্রামের পেছনের আবেগ ও স্বপ্ন প্রকাশ করে রাব্বির মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার বুকের ধন যখন বিদ্যুতের আগুনে পুড়ে দুটো হাতই হারাল, তখন দুনিয়াটা আমার চোখে অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। পোলাটারে বাঁচাইতে পারব কি না সেই আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু ও হার মানে নাই। অমানুষিক কষ্ট সহ্য করে পা দিয়ে লিখে আজ ও আমাদের মুখ উজ্জ্বল করছে। দিনমজুরি করে আমরা হয়তো বড় কিছু দিতে পারি নাই, কিন্তু ওর ইচ্ছাশক্তিই ওকে এতদূর আনছে। সবাই আমার ছেলের বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন পূরণের জন্য দোয়া করবেন।”
রাব্বির এই অভাবনীয় সাফল্যে আবেগাপ্লুত হয়ে স্থানীয় অধিবাসী মো. আকরাম হোসেন বলেন, “আমরা চোখের সামনে ভাটিয়ারীর রাব্বির হাত হারানোর কষ্ট দেখেছি। যেখানে অনেক সুস্থ মানুষ সামান্য বিপদে হতাশ হয়ে পড়ে, সেখানে এই ছেলেটা দুই হাত ছাড়াই পা দিয়ে লিখে ধারাবাহিকভাবে এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে। এটা কেবল ওর পরিবারের জন্য নয়, আমাদের পুরো সীতাকুণ্ডের জন্য এক বিরাট গর্বের বিষয়। ও প্রমাণ করেছে দৃঢ় মনোভাব থাকলে কোনো বাধা আটকিয়ে রাখতে পারে না।”
শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণা ও সামাজিক মূল্যবোধ প্রসঙ্গে সীতাকুণ্ডের বিশিষ্ট সমাজসেবক আলহাজ্ব মোস্তফা কামাল জানান, “রাব্বির এই জয় আমাদের সমাজের সব তরুণের জন্য এক পরম অনুপ্রেরণা। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যে অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে কিছুই না, তা ও বিশ্বকে দেখিয়ে দিল। রাব্বির বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে আমাদের সবার ও সরকারের উচিত এই অদম্য মেধাবীর পাশে দাঁড়ানো।”
কৃতী শিক্ষার্থী রাব্বির উচ্চশিক্ষার সুযোগ ও স্বাস্থ্যসেবা প্রসঙ্গে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শিব্বীর আহমেদ প্রিন্স জানান, “দুটি হাত হারানোর পর মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে পা দিয়ে লেখার দক্ষতা তৈরি করা এবং বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া এক অলৌকিক ও অভাবনীয় অর্জনের মতো। তাঁর এই শারীরিক ও মানসিক লড়াই অতুলনীয়। ভবিষ্যতে রাব্বির যেকোনো স্বাস্থ্যসেবা ও মেডিক্যাল সহায়তায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করা হবে।”
শিক্ষার্থী রাব্বির এই সাফল্যে অভিনন্দন ও সহায়তার আশ্বাস দিয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, “সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর অদম্য তরুণ রাব্বির পা দিয়ে লিখে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার ঘটনাটি পুরো উপজেলা ও দেশের জন্য অত্যন্ত গর্বের। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করা এই রত্নকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে এবং তাঁর উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে সব ধরনের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।”

















